জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তথ্যচিত্র নিয়ে বিতর্কের জেরে হট্টগোলের ঘটনা ঘটেছে।

রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা’ শিরোনামে অনুষ্ঠানে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ ছিলেন প্রধান অতিথি।

অনুষ্ঠানে প্রচারিত একটি তথ্যচিত্র বা ডকুমেন্টারিতে জুলাই আন্দোলনের ধারাবাহিকতা সঠিকভাবে তুলে না ধরা হয়েছে—এমন অভিযোগ তোলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারা। এ নিয়ে বাগ্‌বিতণ্ডা হয় এবং পরে এনসিপি নেতারা অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করেন। হট্টগোলের এক পর্যায়ে কূটনীতিদেরও বেরিয়ে যেতে দেখা যায়।

এ ঘটনার কয়েকটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। একটি ভিডিওতে দেখা যায়, তথ্যচিত্রে ১ দফা ঘোষণা, ৯ দফা–সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথিদের কেউ কেউ প্রতিবাদ জানাতে থাকেন।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক মাহিন সরকার। তিনি ফেসবুকে লিখেছেন, তথ্যচিত্রে ১ দফার ঘোষক বানানো হয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে। যে নাহিদ ইসলাম (এনসিপির আহ্বায়ক) নিজের মৃত্যু পরোয়ানায় সই করেন ১ দফার ঘোষণা দিলেন, তিনি বিএনপির ইতিহাসে নেই। যে আসিফ মাহমুদ (এনসিপির মুখপাত্র) মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ ঘোষণা করলেন তিনি ইতিহাসে নেই।

মাহিন সরকার আরও লিখেছেন, অনুষ্ঠানে প্রদর্শিত তথ্যচিত্রের প্রতিবাদ করার কারণে প্রধানমন্ত্রীর বাহিনী তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। রাষ্ট্রপতির সামনে তাঁর ওপর হামলা করা হয়েছে।

ভিডিওতে দেখা যায়, হট্টগোলের মধ্যে মঞ্চ থেকে অনুষ্ঠানের উপস্থাপক সবাইকে শান্ত হওয়ার জন্য বারবার আহ্বান জানান। তবু পরিস্থিতি স্থিতিশীল হয়নি।

এর মধ্যে মঞ্চে ওঠেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান। তিনি বলেন, ‘আমি সকলকে শান্ত হওয়ার জন্য অনুরোধ করছি।’ একই সঙ্গে তথ্যচিত্রে কোনো ভুল থাকলে তা সংশোধনের কথাও বলেন তিনি।

তবে দর্শকসারিতে ‘আমাদের নিয়ে তালবাহানা করা চলবে না’সহ নানা স্লোগান চলতে থাকে। মন্ত্রীকেও বারবার অনুরোধ করতে দেখা যায়।

পরিস্থিতি শান্ত না হওয়ায় মাইকের সামনে আসেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। তিনি অনেকটা ধমকের সুরে বলেন, ‘আপনারা কী নিজেদের জাহির করার জন্য আসছেন?’

ইশরাক হোসেন স্লোগানদাতাদের উদ্দেশ করে বলেন, ‘কী করছেন আপনারা? আপনারা শহীদ পরিবারদের জন্য কী করেছেন? কিছুই করেন নাই আপনারা।’

এরপর আহমেদ আযম খান ইশরাক হোসেনকে শান্ত করার চেষ্টা করেন। একই সময়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ মাইকের সামনে আসেন। তিনি বলেন, ‘আপনাদের মধ্য থেকে যাঁরা বক্তব্য দিতে চান, দয়া করে আপনারা এখানে এসে কথা বলুন।...আপনাদের বক্তব্য...আপনারা বলুন; আমরা শুনব। কিন্তু শান্তশিষ্টভাবে বসুন দয়া করে।’

কথা বলার মাঝে এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেনকে কয়েক বার ডাকেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। কিছুক্ষণ পর আখতার হোসেন মঞ্চে ওঠেন। তিনি বলেন, ‘আমি জুলাই যোদ্ধাদের একজন হয়ে এবং আমার দলের একজন প্রতিনিধি হিসেবে এই প্রোগামের সফলতা কামনা করি; কিন্তু আমার ব্যক্তিগত পক্ষে এবং আমার যে সহযোদ্ধারা আছেন, তাঁদের জন্য একটি সুন্দরের আকাঙ্ক্ষায় আমার পক্ষে এই প্রোগামে অবস্থান করা সম্ভবপর নয়।’

আখতার আরও বলেন, ‘আমি আজকের এই অনুষ্ঠানের মাননীয় রাষ্ট্রপতি, তাঁকে আমি ধন্যবাদ জ্ঞাপন করি। তিনি বাংলাদেশের পক্ষে যেভাবে অবস্থান নিয়েছেন, সেটাকে আমরা ধারণ করি। তিনি একই সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা, একই সঙ্গে জুলাই যোদ্ধা, তাঁর প্রতি সম্মান ব্যক্ত করছি। সেই সম্মান রেখে আমি নীরবে এখান থেকে প্রস্থান করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলাম।’

মঞ্চ ছাড়ার আগে এনসিপির সদস্যসচিব বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় একটা প্রোগ্রামেও আমরা ইতিহাসের সবকিছুকে আমরা ধারণ করতে ব্যর্থ হলাম। আপনারা খেয়াল করে দেখবেন, এই বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে যেমন একপেশেভাবে আওয়ামী লীগ দখল করেছিল; ঠিক একই ধরনের একটা পরিস্থিতি এখানে তৈরি হয়েছে।’

আখতার হোসেন অভিযোগ করেন, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্যচিত্রে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও ৯ দফার কথা উল্লেখ করা হয়নি। ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট শহীদ মিনারে যে এক দফার ঘোষণা দেওয়া হলো, সে বিষয়টাও নেই।

অনুষ্ঠানে বিশৃঙ্খলার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ভুলত্রুটি মানুষের হতেই পারে। সবাই মিলে সেসব ভুল সংশোধন করতে হবে। তবে জাতীয় অনুষ্ঠানে বিদেশিদের সামনে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে তিনি গভীরভাবে ব্যথিত ও মর্মাহত হয়েছেন।

এ প্রসঙ্গে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘এইভাবে যে বিদেশের সামনে, বিদেশি অতিথিদের সামনে যে নাস্তানাবুদ হলাম, এটি আমাকে খুবই ব্যথিত করেছে। এবং এই ঘটনায় সবচেয়ে খুশি হবে যিনি পাশের দেশে বসে আছেন, তাঁর জন্য অত্যন্ত আনন্দের একটি দিন।’

অনুষ্ঠানে প্রদর্শিত তথ্যচিত্রে ভুলের সমালোচনা করে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বলেন, সেখানে শহীদ আবু সাঈদের ছবি ছিল না। অথচ আবু সাঈদ জুলাই বিপ্লবের প্রতিচ্ছবি ও প্রতীক। তাঁর ছবি ছাড়া ওই আন্দোলনের কোনো তথ্যচিত্র পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না।

এছাড়া বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ছবিও তথ্যচিত্রে ছিল না বলে উল্লেখ করেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি।

এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ নিজের বক্তব্যে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে ‘দলীয়করণ করা যাবে না’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা যদি বলি জুলাই কার? জুলাই কার? তাহলে জুলাই আমাদের কারোই থাকবে না। এই অবস্থা থেকে আমাদের মুক্তি পেতে হবে।’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ঘটনার বিষয়ে নানা আলোচনা চলছে এবং কয়েকটি ভিডিও এরই মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে।