ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেছেন, ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানে আত্মাহুতি দেওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের দায়িত্ব নেওয়া এবং আহতদের চিকিৎসা নিশ্চিত করাকে সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও পবিত্র দায়িত্ব হিসেবে দেখতে হবে। তিনি বলেন, দৃষ্টি ও অঙ্গ হারানো ব্যক্তিদেরও সুস্থ করে তোলার দায়িত্ব সরকারকে নিতে হবে।
আজ বুধবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘জুলাই গণ–অভ্যুত্থান শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা’ অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
জুলাই গণ–অভ্যুত্থান রাষ্ট্র পুনর্গঠনের সুযোগ এনে দিয়েছে উল্লেখ করে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, একটি গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলাই সবার লক্ষ্য হওয়া উচিত—যেখানে প্রতিটি নাগরিক সমান অধিকার ও মর্যাদা পাবে।
তিনি বলেন, ‘নতুন যাত্রার’ সময় মতের ভিন্নতা থাকবেই। জাতীয় স্বার্থ, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে সবাইকে ঐক্য, সংযম ও প্রজ্ঞার পরিচয় দিতে হবে। বিভাজন, বিদ্বেষ বা সংকীর্ণ স্বার্থ যেন জাতীয় অগ্রগতিকে ব্যাহত করতে না পারে—সেজন্য সবার সতর্ক থাকা প্রয়োজন বলে জানান তিনি।
ক্ষমতাচ্যুত ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সমালোচনা করে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘আমরা তো আর আওয়ামী লীগ হতে পারব না, হতেও চাই না।’ আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে খুন, গুম, মানি লন্ডারিং, নির্যাতন ও আয়নাঘরের মতো অভিযোগ থাকার পরও অনুশোচনা নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি। দলের রাজনীতিতে ফেরার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আসেন, দেশে এলে দেখা হবে রাজপথে।’
নিজের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিও তুলে ধরেন হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, ২৭ বছর বয়সে মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। প্রয়োজনে ৮২ বছর বয়সে বাংলাদেশের জন্য আরেকটি যুদ্ধ করবেন। জনগণের শাসন ও গণতন্ত্রকে দেশে স্থায়ী করা হবে বলেও জানান তিনি।
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের ইতিহাসকে গৌরবের ইতিহাস বলে অভিহিত করে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, বিশ্বের অনেক দেশের নাগরিকের মধ্যে এমন সাহসী মানুষ নেই, যাঁরা আবু সাঈদের মতো উদ্ধত সঙিনের সামনে দুই হাত তুলে দাঁড়াতে পারেন। জুলাই যোদ্ধাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, তাঁরা যেন মন খারাপ না করেন। ১৯৭১ সালে যাঁরা জীবন দিয়েছেন, তাঁদেরও অনেক কিছু পাওয়া হয়নি। জুলাই যোদ্ধারাও হয়তো সবকিছু পাবেন না—তবে এই সরকারের কাছ থেকে তাঁরা সম্মান পাবেন এবং দেশের সামর্থ্য অনুযায়ী তাঁদের কল্যাণে সবকিছু করার চেষ্টা করা হবে।
তিনি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণ–অভ্যুত্থান—দুটিকেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম হিসেবে উল্লেখ করেন। এ বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বলেন, নির্বাচন গণতন্ত্রের অন্যতম অনুষঙ্গ। দেশে যত দিন গণতন্ত্র থাকবে এবং সাধারণ মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, তত দিন দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বও অক্ষুণ্ন থাকবে। তাই গণতন্ত্রকে কোনোভাবেই হেলাফেলা করা যাবে না বলেও জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের ওপর ভিডিও প্রচার করা হয়। তাতে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের অন্যতম প্রতীক শহীদ আবু সাঈদের ছবি বা ভিডিও ছিল না বলে উপস্থিত কয়েকজন এর প্রতিবাদ জানান। এতে অনুষ্ঠানস্থলে হট্টগোলের সৃষ্টি হয়। এ ঘটনায় হতাশা প্রকাশ করে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বলেন, ভুলত্রুটি মানুষের হতেই পারে এবং সবাই মিলে সেগুলো সংশোধন করতে হবে। তবে জাতীয় অনুষ্ঠানে বিদেশিদের সামনে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে তিনি গভীরভাবে ব্যথিত ও মর্মাহত হয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এভাবে যে বিদেশি অতিথিদের সামনে যে নাস্তানাবুদ হলাম, এটি আমাকে খুবই ব্যথিত করেছে। এ ঘটনায় সবচেয়ে খুশি হবে যিনি, তিনি পাশের দেশে বসে আছেন, তাঁর জন্য অত্যন্ত আনন্দের একটি দিন।’
ভিডিও চিত্রের বিষয়ে তিনি আরও বলেন, সেখানে আবু সাঈদের ছবি ছিল না। অথচ আবু সাঈদ জুলাই বিপ্লবের প্রতিচ্ছবি ও প্রতীক। তাঁর ছবি ছাড়া ওই আন্দোলনের কোনো ডকুমেন্টারি পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না বলে উল্লেখ করেন তিনি। একইভাবে বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ছবিও সেখানে ছিল না বলে জানান ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি।
ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি অনুষ্ঠানে শহীদদের গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করেন। তিনি বলেন, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে আবু সাঈদ, মুগ্ধ, ওয়াসিম, ইয়ামিন, ফারহান, নাফিজ, সজল, রাব্বি, মেরাজ, এনাম, তাইম, নাইমা, ছোট্ট শিশু ইয়াকুব, আহাদসহ হাজারো মানুষ আত্মত্যাগ করেছেন। তাঁদের আত্মদান ও দেশপ্রেম ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে বলেও জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকার জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার; আকাশ থেকে উড়ে এসে ক্ষমতায় বসেনি। তাই নির্বাচিত সরকারের প্রতি অন্তত শ্রদ্ধা ও সম্মান থাকা উচিত। ভুল সরকারও করবে, ভবিষ্যতেও হয়তো করবে—ভুলের জন্য সরকারকে মূল্যও দিতে হবে—তবে সবাই মিলে ভুল সংশোধনের চেষ্টা করতে হবে বলে মন্তব্য করেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি।
সকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জুলাই জাদুঘরের উদ্বোধন করেন। ওই অনুষ্ঠানের উদাহরণ টেনে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস নিচে বসেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী তাঁকে ডেকে এনে সম্মান দেখিয়েছেন এবং পাশে বসিয়েছেন—এটাই হওয়া উচিত বলেও তিনি মত দেন। সবাইকে সম্মান করা হবে এবং কাউকে অপমান করার চেষ্টা করা হবে না বলেও জানান ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি।
জুলাইয়ের আহত ব্যক্তিদের দুর্দশার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, একজন মা তাঁর অন্ধ ছেলেকে নিয়ে অনুষ্ঠানে দাঁড়িয়ে ছিলেন। গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁর ছেলে চোখ হারিয়েছেন। অথচ তাঁদের যদি যথাযথ মর্যাদা না দেওয়া হয় এবং সামান্য চাওয়া-পাওয়ার জন্য মন্ত্রীদের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়, তাহলে সেটি পুরো জাতির জন্য লজ্জার হবে বলে মন্তব্য করেন হাফিজ উদ্দিন আহমদ।