মহাকাশের অসীম শূন্যতায় লুকিয়ে থাকা রহস্যের খোঁজে বিজ্ঞানীদের নতুন তথ্যে সামনে এসেছে এক চমকপ্রদ বিষয়। বৃহস্পতি গ্রহকে প্রদক্ষিণ করা সৌরজগতের সবচেয়ে বড় উপগ্রহ গ্যানিমিডের বরফাবৃত পৃষ্ঠতলের নিচে রয়েছে একটি বিশাল মহাসাগর।

আকারে বুধ গ্রহের চেয়ে বড় এই গ্যানিমিড উপগ্রহটি কেবল আকৃতিতেই নয়, বরং গঠনের দিক থেকেও অনেকটা গ্রহের মতো। নাসার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গ্যানিমিড বুধ এবং প্লুটো—উভয় গ্রহের চেয়ে বড়। বরফ ও পাথরের সমন্বয়ে গঠিত এই উপগ্রহের ভেতরে পৃথিবীর সব মহাসাগরের সম্মিলিত পানির চেয়েও বেশি পানি রয়েছে। উপগ্রহটি প্রায় ৫ হাজার ২৬০ কিলোমিটার ব্যাসের। তবে ঘন পাথর ও ধাতুর পরিবর্তে বরফের আধিক্যের কারণে এটি বুধ গ্রহের তুলনায় ওজনে কিছুটা হালকা।

১৬১০ সালে বিজ্ঞানী গ্যালিলিও গ্যালিলি বৃহস্পতির এই উপগ্রহটি আবিষ্কার করেন। সেই আবিষ্কার তৎকালীন সময়ে পৃথিবীর কেন্দ্রিক মহাবিশ্বের প্রচলিত বিশ্বাসকে বদলে দিয়েছিল। বিজ্ঞানীদের মতে, গ্যানিমিডের পৃষ্ঠতলে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার পুরু বরফের স্তর রয়েছে। এছাড়া এটি সৌরজগতের একমাত্র উপগ্রহ যার নিজস্ব চৌম্বকক্ষেত্র রয়েছে।

হাবল স্পেস টেলিস্কোপের প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, গ্যানিমিডের ১৫০ কিলোমিটার পুরু বরফের আস্তরণের নিচে এক বিশাল লোনাপানির সমুদ্র বিস্তৃত। ধারণা করা হচ্ছে, এই সমুদ্রের গভীরতা প্রায় ১০০ কিলোমিটার হতে পারে। বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস, সমুদ্রের পানি গভীর তলদেশে পাথরের সংস্পর্শে আসে, যা অণুজীব বা প্রাণের অস্তিত্বের অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

গ্যানিমিডের সবচেয়ে অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো এর চৌম্বকক্ষেত্র, যা ১৯৯৬ সালে গ্যালিলিও মহাকাশযান প্রথম শনাক্ত করে। সৌরজগতের অন্য কোনো উপগ্রহের নিজস্ব চৌম্বকক্ষেত্র নেই। ধাতব কোর থেকে সৃষ্ট এই চৌম্বকক্ষেত্রের প্রভাবে গ্যানিমিডের মেরু অঞ্চলে আলোচ্ছটা বা অরোরা তৈরি হয়। পাশাপাশি নাসার জুনো মহাকাশযান গ্যানিমিডের পৃষ্ঠে খনিজ লবণ ও জৈব যৌগের উপস্থিতি চিহ্নিত করেছে।

গ্যানিমিড কেবল বৃহস্পতির চারপাশে প্রদক্ষিণ করে বলেই একে উপগ্রহ বলা হয়; এটি যদি সূর্যের চারপাশে স্বাধীনভাবে ঘুরত, তবে একে গ্রহ হিসেবেই গণ্য করা হতো। নাসা এবং অন্যান্য মহাকাশ সংস্থার নিরন্তর গবেষণায় এই বরফাবৃত রহস্যময় জগত সম্পর্কে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন বিস্ময়কর তথ্য উন্মোচিত হচ্ছে।