নেটফ্লিক্সের সিরিজ ‘মুসাফির ক্যাফে’-র মাধ্যমে সম্প্রতি ব্যাপক আলোচনায় এসেছেন তরুণ অভিনেত্রী মহিমা মাকওয়ানা। তবে পর্দার এই ঝলমলে জীবনের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক কঠিন শৈশবের গল্প। আজ ৫ আগস্ট অভিনেত্রীর জন্মদিন। এই বিশেষ দিনে জেনে নেওয়া যাক তাঁর জীবনসংগ্রামের কথা।

মহিমার জীবন শুরু হয়েছিল চরম প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে। জন্মের মাত্র পাঁচ মাস পরেই তিনি বাবাকে হারান, যার ফলে বাবার কোনো স্মৃতিই তাঁর নেই। পরিবারের পুরো দায়িত্ব এসে পড়ে মায়ের কাঁধে। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকলেও সেই সামান্য আয়ে সংসার চালানো ছিল অসম্ভব। ফলে মুম্বাইয়ের একটি ঘিঞ্জি চাওলে (ঘনবসতিপূর্ণ আবাসন) মা ও ভাইকে নিয়ে বড় হতে হয় তাঁকে।

মা একসময় অভিনেত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। সেই অপূর্ণ স্বপ্নই তিনি মেয়ের মধ্যে খুঁজে পান। মাত্র ৯ বছর বয়স থেকেই মহিমাকে অডিশনে নিয়ে যাওয়া শুরু হয়। তবে শৈশবের সেই দিনগুলো তাঁর কাছে আনন্দের ছিল না। স্কুল শেষ করে বাসে করে এক অডিশন থেকে অন্য অডিশনে ছুটে বেড়ানো ছিল এক ক্লান্তিকর রুটিন। বন্ধুরা যখন খেলাধুলা আর স্কুলজীবন উপভোগ করত, মহিমা তখন কাটাতেন শুটিং ফ্লোরে। নিয়মিত স্কুলে যাওয়ার সুযোগ না থাকায় অনেক সময় কেবল পরীক্ষার দিনই তিনি ক্লাসে উপস্থিত হতে পারতেন।

পরিবারের আর্থিক সংকট ও বেঁচে থাকার লড়াই নিয়ে এক সাক্ষাৎকারে মহিমা বলেন, "পরিবারের আর্থিক অবস্থা এমন ছিল যে উপার্জনের অন্য কোনো পথ ছিল না। অভিনয় তাঁর কাছে পেশা হওয়ার আগেই দায়িত্ব হয়ে উঠেছিল।"

শিশুশিল্পী হিসেবে কাজ করার সময় এক তিক্ত অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনদর্শন বদলে দেয়। একটি জনপ্রিয় ধারাবাহিকের সেটে অভিজ্ঞ অভিনেতাদের সামনে সংলাপ বলতে গিয়ে তিনি নার্ভাস হয়ে পড়েন। দৃশ্যটি সঠিকভাবে করতে না পারায় পরিচালকের কঠোর সমালোচনা তাঁকে গভীরভাবে আঘাত করে। তবে সেই অপমানে ভেঙে না পড়ে তিনি আরও কঠোর পরিশ্রমের সংকল্প করেন। মহিমা পরে বলেছেন, "সেই ঘটনাই তাঁকে বুঝিয়েছিল—এই পেশায় টিকে থাকতে হলে প্রতিভার পাশাপাশি কঠোর পরিশ্রমেরও বিকল্প নেই।"

কিশোর বয়সে ছোট পর্দায় বড় সুযোগ আসায় বদলে যায় তাঁর পরিবারের ভাগ্য। মাত্র ১৪ বছর বয়সে তিনি মুম্বাইয়ের মীরা রোড এলাকায় পরিবারের জন্য প্রথম বাড়ি এবং নিজের প্রথম গাড়ি কেনেন। ভাড়াবাড়ির জীবন থেকে মুক্তি পাওয়া ছিল তাঁর পরিবারের জন্য এক স্বপ্নপূরণ। মহিমার ভাষায়, "তাঁর মায়ের একটাই ইচ্ছা ছিল—নিজেদের একটি বাড়ি হবে। সেই স্বপ্ন পূরণ করাই হয়ে উঠেছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য।"

টেলিভিশনে জনপ্রিয় হয়ে উঠলেও সিনেমা ও ওটিটি প্ল্যাটফর্মে জায়গা করে নেওয়া সহজ ছিল না। বহু অডিশনে ব্যর্থতা এবং শেষ মুহূর্তে প্রকল্প বাতিল হওয়ার মতো অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয় তাঁকে। বিশেষ করে ‘টেলিভিশনের অভিনেত্রী’ তকমা কাটিয়ে বড় পর্দায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে বছরের পর বছর লড়াই করতে হয়েছে।

ধীরে ধীরে বিভিন্ন ভাষার চলচ্চিত্র ও ওটিটি সিরিজে কাজ করে নিজের পরিধি বাড়ান তিনি। সম্প্রতি ‘মুসাফির ক্যাফে’-তে তাঁর অভিনয় দর্শক ও সমালোচকদের প্রশংসা কুড়িয়েছে। বর্তমানে মুম্বাইয়ে আরও বড় একটি বাড়ির মালিক মহিমা, যেখানে তিনি তাঁর মায়ের সঙ্গে থাকেন। তবে সব প্রাপ্তির মাঝেও এক শূন্যতা রয়ে গেছে তাঁর মনে। বাবাকে কখনো দেখার সুযোগ না পাওয়ার কষ্ট তাঁকে তাড়া করে বেড়ায়। তিনি জানিয়েছেন, বন্ধুদের বাবার সঙ্গে সম্পর্ক দেখলে তাঁর মনে হয়, জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুভূতি তিনি কখনোই জানতে পারেননি।