রাজধানীর বকশীবাজারের সরকারি মাদ্রাসা–ই–আলিয়া (আলিয়া মাদ্রাসা) এলাকায় সংঘর্ষের পর ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতা–কর্মীরা এলাকা ছেড়ে গেছেন। আজ মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে তাদের চলে যাওয়ার পর মাদ্রাসার একমাত্র আবাসিক হল আল্লামা কাশগরী (রহ.) হলে প্রবেশ করেন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতা–কর্মীরা।
‘সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে যুবদলের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সদস্যসচিব রবিউল ইসলাম নয়নের নেতৃত্বে ছাত্রদল ও যুবদলের কয়েকশ নেতাকর্মী আলিয়া মাদ্রাসার হলে প্রবেশ করেন। এ সময় পুলিশ সদস্যরা বাইরে অবস্থান করছিলেন।’
হল কর্তৃপক্ষের কাছে থাকা ফটকে তালা লাগানোর সময় উপস্থিত ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার ফাজিল প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ও ছাত্রদলের নেতা মো. ইব্রাহীম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার জন্য আমরা হল তালাবন্ধ করেছি। সব কিছু ঠিক হলে পরবর্তীতে খুলে দেওয়া হবে।’
হল ত্যাগ করার আগে ছাত্রশিবিরের নেতা–কর্মীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা কয়েকটি কক্ষে ভাংচুর চালানোর অভিযোগ ওঠে ছাত্রদল ও যুবদলের নেতা–কর্মীদের বিরুদ্ধে। পরে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মোহাম্মদ ওবায়দুল হককে মারধর করা হয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়। এসব ঘটনার পর হলে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের বের হয়ে যেতে বলেন ছাত্রদল নেতা–কর্মীরা এবং তারা ফটকে তালা লাগিয়ে দেন।
সংঘর্ষে আহতের বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন দাবি এসেছে। ইসলামী ছাত্রশিবিরের ঢাকা মহানগর পূর্বের প্রচার ও মিডিয়া সম্পাদক দাউদ খান জানিয়েছেন, তাদের ২৫ জন নেতা–কর্মী আহত হয়েছেন। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘যুবদল ও ছাত্রদলের সন্ত্রাসী হামলা চালিয়ে আমাদের নেতা–কর্মীদের আহত করেছে। ফুয়াদ নামে আমাদের এক কর্মীর অবস্থা সংকটাপন্ন। তাঁর মাথায় ১২টি সেলায় দেওয়া লেগেছে।’
অপরদিকে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের ৩০ জনের বেশি নেতা–কর্মী আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন সংগঠনটির ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা শাখার নেতা সাদ চৌধুরী। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘শিবিরের সন্ত্রাসীরা দফায় দফায় আমাদের ওপর হামলা করেছে। তাঁদের হামলায় আমাদের ৩০ জনের অধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছে। আহতদের মধ্যে ছাত্রদল ও যুবদলের দুইজনের অবস্থা গুরুতর।’
জুলাই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে সকালে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত একটি সেমিনারে অংশগ্রহণকে ঘিরে ইসলামী ছাত্রশিবির ও জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতা–কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের পর আলিয়া মাদ্রাসা এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। উত্তেজনার এক পর্যায়ে বেলা তিনটার দিকে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতা–কর্মীদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে; এতে উভয়পক্ষের বেশ কয়েকজন আহত হন। এরপর ছাত্রদল মাদ্রাসার বাইরে এবং ছাত্রশিবিরের নেতা–কর্মীরা মাদ্রাসার ভেতরে অবস্থান নেন।
প্রায় দুই ঘণ্টা সংঘর্ষ বন্ধ থাকার পর মাদ্রাসার সামনের সড়কে যান চলাচল শুরু হয়। এ সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ঘটনার জন্য ছাত্রদলকে দায়ী করেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের আলিয়া মাদ্রাসা শাখার সভাপতি আবদুল আলিম। তিনি তখন সাংবাদিকদের বলেন, দুপুরের দিকে হঠাৎ ছাত্রদলের নেতা–কর্মীরা হলে ঢুকে শিবিরের নেতা–কর্মীদের মারধর করে হলের বেশ কয়েকটি রুমে তালা দেন। এরপর তাঁরা ছাত্রদল নেতা–কর্মীদের ধাওয়া দিয়ে হল থেকে বের করে দেন। পরে ছাত্রদল আবার দলবল নিয়ে এলে শিবিরের নেতা–কর্মীদের সঙ্গে তাঁদের সংঘর্ষ হয়।
সংঘর্ষের সূত্র ধরে বিকেল সোয়া পাঁচটার দিকে দ্বিতীয় দফায় ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতা–কর্মীরা সংঘর্ষে জড়ান। প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে মাদ্রাসার সামনের সড়কে দুই পক্ষ ইট–পাটকেল নিক্ষেপ ও পাল্টাপাল্টি ধাওয়া দেয়। দুই পক্ষের সংঘর্ষে ওই এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। ওই এলাকায় সাত থেকে আটটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।
দ্বিতীয় দফার সংঘর্ষ শুরু হওয়ার আগেই পুলিশ সদস্যরা দুই পক্ষের মাঝে অবস্থান নিলেও সংখ্যায় কম হওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে পুলিশের উপস্থিতি বাড়ে; এরপরও পাল্টাপাল্টি ধাওয়া চলতে থাকে। সন্ধ্যা ৬টার দিকে ছাত্রশিবিরের নেতা–কর্মীরা ওই এলাকা সরে যান।
এদিকে ছাত্রশিবির নেতা–কর্মীদের অবস্থান নিয়েও অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ উঠে। ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা শাখা ছাত্রদল নেতা সাদ চৌধুরী মুক্তকণ্ঠকে জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে শিবিরের নেতা–কর্মীরা হলের বেশ কয়েকটি কক্ষ দখল করে রেখেছেন। গতকাল রাতে তাঁরা বহিরাগত ব্যক্তিদের হলে এনে রাখেন। আজ শিবিরের নেতা–কর্মীরা ছাত্রদলের একটি রুম তালাবন্ধ করে রাখেন। এরপর ছাত্রদল বেশ কয়েকটি রুমে তালা লাগালে শিবিরের নেতা–কর্মীদের সঙ্গে তাঁদের মারামারি শুরু হয়।