কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখন দৈনন্দিন কাজ, পড়াশোনা ও কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে গেছে। ভবিষ্যতে জ্ঞাননির্ভর বহু পেশায় এআই প্রায় সবাইকেই ব্যবহার করতে হবে—এমন বাস্তবতায় শিক্ষার শুরু থেকেই, অর্থাৎ স্কুল পর্যায় থেকেই ‘এআই সাক্ষরতা’ গড়ে তোলা জরুরি। এআই কীভাবে কাজ করে, এর সম্ভাবনা কী, আর নৈতিকভাবে কীভাবে ব্যবহার করতে হয়—এসব ধারণা শিক্ষার্থীদের মধ্যে গেঁথে দেওয়ার সময় এখন।
ভারতের প্রথম রাজ্য হিসেবে পাঞ্জাব সম্প্রতি সব সরকারি স্কুলে প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত এআই শিক্ষা বাধ্যতামূলক করেছে। একসময় ভারতে সবুজবিপ্লবে নেতৃত্ব দেওয়া পাঞ্জাব এবার দেশটিতে এআই–বিপ্লবে নেতৃত্ব দেওয়ার দিকেও ভাবছে।
‘সর্বত.এআই’ (Sarbat.AI) নামের একটি প্রকল্পের মাধ্যমে তারা কেবল বিত্তবান বা বেসরকারি স্কুলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে নয়; বরং গ্রামীণ ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের কাছেও বিশ্বমানের প্রযুক্তিশিক্ষা পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে। পাঞ্জাবি ভাষায় ‘সর্বত’ শব্দের অর্থ ‘সবার জন্য’। ফলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিক্ষা হবে সবার জন্য উন্মুক্ত।
পাঞ্জাব স্কুল এডুকেশন বোর্ডের অধীনে রাজ্যের ২৫ হাজার ১৭২টি স্কুলে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। এতে সরাসরি উপকৃত হবে প্রায় সাড়ে ৩১ লাখ শিক্ষার্থী। বিশ্বজুড়ে এআই ও ডেটা সায়েন্সভিত্তিক কাজের সুযোগ যেভাবে বাড়ছে, তার জন্য শিক্ষার্থীদের আগাম প্রস্তুত করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
প্রকল্পটি বাস্তবায়নে পরিকল্পনাটি দুই ধাপে সাজানো হয়েছে। বয়সে বড় শিক্ষার্থীদের বোধগম্যতা বেশি হওয়ায় প্রথম ধাপে অষ্টম থেকে দ্বাদশ শ্রেণিতে এআই যুক্ত করা হয়েছে। এটি কম্পিউটার সায়েন্স পাঠ্যক্রমের অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে; তাত্ত্বিক বিষয়ের পাশাপাশি প্রজেক্টভিত্তিক শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা হাতে-কলমে কাজ শিখছে। ছোটদের জন্য তৈরি করা হয়েছে বয়সোপযোগী পাঠ্যক্রম। এই বয়সে জটিল কোডিং না শিখিয়ে ‘কম্পিউটেশনাল থিঙ্কিং’ বা গাণিতিক চিন্তা, লজিক বিল্ডিং ও প্রযুক্তি পরিচিতির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে গেম ও নানাবিধ বিনোদনমূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে।
পাঞ্জাবের এই উদ্যোগের আগে সিঙ্গাপুর, ফিনল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলোর এআই শিক্ষাব্যবস্থা পর্যালোচনা করে সিলেবাস তৈরি করা হয়েছে। শিক্ষাক্রমটির বিশেষ দিক হলো, এটি ইউনেসকোর ‘এথিক্যাল এআই ফ্রেমওয়ার্ক’ অনুসরণে তৈরি। প্রযুক্তির ব্যবহারের পাশাপাশি নৈতিক দিকও শেখানো হবে—ডেটা প্রাইভেসি তথা ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষার নিয়মাবলি, ডিপফেক ও এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া ছবি বা তথ্য শনাক্ত করার কৌশল এবং অ্যালগরিদমিক বায়াস বা অ্যালগরিদমের পক্ষপাত এড়ানোর উপায়। দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির সঙ্গে মানিয়ে নিতে প্রতি ছয় মাস পরপর সিলেবাস হালনাগাদ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজ্য সরকার।
যেকোনো নতুন শিক্ষাক্রমের সফলতা শিক্ষকদের দক্ষতার ওপর নির্ভর করে। এজন্য শিক্ষকদের দক্ষ করে তুলতে বড় পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক প্রশিক্ষণ হিসেবে প্রথম ধাপে ১২ হাজার ৪২৪ জন কম্পিউটার সায়েন্স শিক্ষককে নিবিড় প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে রাজ্যের প্রায় দুই লাখ শিক্ষককে এআই ব্যবহারে দক্ষ করা হবে, যাতে বিজ্ঞান, গণিত কিংবা ভাষার শিক্ষকেরাও শ্রেণিকক্ষে এআই টুল ব্যবহার করে পড়া সহজ করতে পারেন। একই সঙ্গে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য একটি সেন্ট্রাল পোর্টাল চালু করা হয়েছে, যেখানে লাইভ ক্লাস, ভিডিও টিউটোরিয়াল ও অনুশীলনী রয়েছে।
বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকতে হলে এবং জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তুলতে হলে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে শুরু থেকেই এআই সাক্ষরতায় দক্ষ করে তুলতে হবে। এটি কেবল প্রযুক্তি শেখার বিষয় নয়; বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের অন্যতম মূল চাবিকাঠি।
বিশাল এই কর্মযজ্ঞে গুগল, ইন্টেল, ক্যানভা ও নিভ এআইয়ের মতো বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করা হয়েছে। এতে সরকারি স্কুলের শিক্ষার্থীরা বিনা মূল্যে ক্লাউড কম্পিউটিং ও বিশ্বমানের এআই টুল ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছে। অবকাঠামো উন্নয়নে আড়াই হাজার কোটি রুপির বেশি বিনিয়োগ করা হয়েছে। এর আওতায় ল্যাব তৈরি, স্মার্ট প্যানেল বসানো ও হাই স্পিড ওয়াই-ফাই নিশ্চিত করা হচ্ছে। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের বিনা মূল্যে নতুন এআই পাঠ্যবই দেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে ভারতেও একটি বড় মিল রয়েছে—অত্যাধুনিক প্রযুক্তি বা কোডিং শিক্ষার সুযোগ সাধারণত শহুরে দামি প্রাইভেট স্কুলে বেশি পাওয়া যায়। পাঞ্জাবের এই পদক্ষেপ গ্রাম ও শহরের মধ্যকার ‘ডিজিটাল বৈষম্য’ কমাতে সহায়ক হতে পারে। ফলে গ্রামের একজন কৃষকের সন্তানও প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং ও ডেটা বিশ্লেষণের সুযোগ পাচ্ছে—যা ভবিষ্যতে চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়াতে পারে।
পাঞ্জাবের এই পদক্ষেপ দেখায়, রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে সরকারি শিক্ষাব্যবস্থাকেও বৈশ্বিক মানে উন্নীত করা সম্ভব। বিশ্ব অর্থনীতি এখন প্রযুক্তির দিকেই ঝুঁকছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের দ্রুত বিস্তারের এই সময়ে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার প্রস্তুতি নিয়ে আবার ভাবার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ অতিক্রম করে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ার যে লক্ষ্য, তার মূল চালিকা শক্তি হতে পারে প্রযুক্তিদক্ষ তরুণ প্রজন্ম। তবে বাস্তব প্রশ্ন হলো—আমাদের শিক্ষার্থীরা এআই যুগের জন্য কতটা প্রস্তুত?
এ প্রশ্নে ভারতের পাঞ্জাব রাজ্যের ‘সর্বত.এআই’ উদ্যোগটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত এআই শিক্ষা বাধ্যতামূলক করে পাঞ্জাব যে নজির গড়েছে, তার বিপরীতে আমাদের অবস্থান বিচার করলে কয়েকটি মৌলিক ঘাটতি দৃশ্যমান। পাঞ্জাবে এআইকে একটি স্বতন্ত্র ও বাধ্যতামূলক বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অন্যদিকে আমাদের ‘ডিজিটাল প্রযুক্তি’ বইয়ে এআই সম্পর্কে সাধারণ কিছু ধারণা থাকলেও কোডিং, অ্যালগরিদম, মেশিন লার্নিং বা প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মতো প্রায়োগিক দিক অনুপস্থিত। ফলে শিক্ষার্থীরা এআইয়ের ভোক্তা (কনজ্যুমার) হিসেবে গড়ে উঠলেও স্রষ্টা (ক্রিয়েটর) হওয়ার প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জন করতে পারছে না।
বাংলাদেশে, বিশেষ করে মফস্সল ও গ্রামীণ অঞ্চলের স্কুলগুলোতে কারিগরি দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে। অনেক স্কুলে অন্য বিষয়ের শিক্ষকরা ‘ডিজিটাল প্রযুক্তি’র ক্লাস নেন। শিক্ষক নিজেই যদি চ্যাটজিপিটি বা এআই লজিক ব্যবহারে অভ্যস্ত না হন, তবে শিক্ষার্থীদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের বেশির ভাগ সরকারি ও এমপিওভুক্ত স্কুলে এখনো আধুনিক ল্যাব নেই। যেখানে ল্যাব আছে, সেখানেও লোডশেডিং, ধীরগতির ইন্টারনেট বা সচল কম্পিউটারের অভাবে পাঠদান ব্যাহত হয়। এতে শহরের নামীদামি বিদ্যালয়ের সঙ্গে গ্রামের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বড় ধরনের ‘ডিজিটাল বৈষম্য’ তৈরি হয়। পাঞ্জাব সরকার গুগল, ইন্টেল ও ক্যানভার মতো বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি চুক্তি করে পাঠ্যক্রম সাজিয়েছে। বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে কিছু যৌথ উদ্যোগ থাকলেও স্কুল পর্যায়ে এমন আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব গড়ে ওঠেনি।
পাঞ্জাবের অভিজ্ঞতা ধরে বাংলাদেশ কয়েকটি বড় পদক্ষেপ নিতে পারে।
এক. ধাপে ধাপে এআই পাঠ্যক্রম চালু: নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত এআই, পাইথন কোডিং ও ডেটা সায়েন্সকে ঐচ্ছিকের বদলে মূলধারার শিক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। প্রাথমিক স্তরে লজিক বিল্ডিং ও ‘গেমিফায়েড লার্নিং’-এর মাধ্যমে এআইয়ের প্রাথমিক ধারণা দেওয়া যায়।
দুই. ‘ট্রেইন দ্য ট্রেইনার’ মডেলে শিক্ষক উন্নয়ন: কেন্দ্রভিত্তিক লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম তৈরি করে দেশজুড়ে আইসিটি শিক্ষকদের ধারাবাহিক প্রশিক্ষণের আওতায় আনা দরকার। এতে দেশের শীর্ষ প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে যুক্ত করা যেতে পারে।
তিন. নৈতিক এআই শিক্ষা: ডিপফেক, সাইবার বুলিং ও ভুয়া খবরের সয়লাব ঠেকানো এখন বড় চ্যালেঞ্জ। ইউনেসকোর ফ্রেমওয়ার্ক অনুসরণ করে প্রথম থেকেই এআইয়ের নৈতিক ব্যবহার, ডেটা প্রাইভেসি ও সাইবার নিরাপত্তা পাঠ্যক্রমে রাখা দরকার।
চার. পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ: এককভাবে সরকারের পক্ষে সব ল্যাব করা কঠিন। তাই এটুআই বা আইসিটি বিভাগের উচিত গুগল, মাইক্রোসফটের মতো বৈশ্বিক ও দেশীয় আইটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে স্কুলগুলোতে ‘এআই ল্যাব’ স্থাপন করা।
পাঁচ. বাজেট ও ল্যাব রক্ষণাবেক্ষণ: শুধু নীতিমালায় সীমাবদ্ধ না থেকে ডিজিটাল অবকাঠামো তৈরিতে সুনির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ দেওয়া এবং ল্যাবগুলো সচল রাখতে স্বতন্ত্র রক্ষণাবেক্ষণ ফান্ড তৈরি করা উচিত।
বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকতে হলে এবং জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তুলতে হলে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে শুরু থেকেই এআই সাক্ষরতায় দক্ষ করে তুলতে হবে। এটি কেবল প্রযুক্তি শেখার বিষয় নয়; বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের অন্যতম মূল চাবিকাঠি। এ সময়ে দরকার স্পষ্ট রূপকল্প, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সঠিক পদ্ধতিতে বাস্তবায়নের উদ্যোগ।