চিকিৎসা ব্যয়ের ভার বহন করতে গিয়ে দেশের এক বিশাল জনগোষ্ঠী প্রতিনিয়ত নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জনগণকে প্রায় ৬৯ শতাংশ ব্যয়ের বোঝা বহন করতে হয়, যা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। ২০২৪ সালের এক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, সরকার নাগরিক স্বাস্থ্যের জন্য মাথাপিছু ব্যয় করে মাত্র ৫৪ ডলার; যেখানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হলে ন্যূনতম ৮৮ ডলার ব্যয় করা প্রয়োজন।
জিডিপির ১ শতাংশের কাছাকাছি বরাদ্দ রেখে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা প্রায় অসম্ভব। তবে প্রশ্ন উঠেছে, বিদ্যমান বাজেটটি কি নাগরিকদের জন্য সঠিকভাবে ব্যয় করা হচ্ছে? স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের অর্থায়নে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) পরিচালিত এক গবেষণায় স্পষ্ট করা হয়েছে যে, স্বাস্থ্য খাতের মূল সমস্যা বাজেট নয়, বরং ব্যবস্থাপনা।
সংবাদমাধ্যমে প্রায়ই উঠে আসে উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগনির্ণয় যন্ত্র অকেজো থাকার খবর। পিপিআরসির গবেষণায় দেখা গেছে, সরকারি হাসপাতালের ৫২ শতাংশ রোগনির্ণয় যন্ত্র অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। এক্স-রে ও আলট্রাসনোগ্রামের মতো অত্যাবশ্যকীয় সেবাগুলো কার্যকর না থাকায় রোগীরা বেসরকারি ক্লিনিক বা হাসপাতালে যেতে বাধ্য হন। এতে একদিকে যেমন জনগণের অর্থের অপচয় হচ্ছে, অন্যদিকে বাড়তি ব্যয় করে সেবা নিতে হচ্ছে।
বিগত সরকারের আমলে স্বাস্থ্য খাতটি অবকাঠামো নির্মাণ ও কেনাকাটার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল। প্রয়োজন ছাড়াই একের পর এক ভবন নির্মাণ করা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগ না করেই রোগনির্ণয় যন্ত্র কেনা হয়েছে। ফলে স্বাস্থ্য বাজেটের একটি বড় অংশ বিভিন্ন সিন্ডিকেট ও সরকারঘনিষ্ঠ ঠিকাদারদের পকেটে গেছে বলে মনে করা হয়।
সাধারণত দরিদ্র ও সীমিত আয়ের মানুষ সরকারি হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীল। লোকবলসংকট এই জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টের অনুমোদিত পদের ৪০ শতাংশ শূন্য থাকায় রোগনির্ণয় যন্ত্রগুলো অলস পড়ে নষ্ট হচ্ছে। এছাড়া যন্ত্রপাতি মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রক্রিয়া অতিরিক্ত কেন্দ্রীভূত হওয়ায় আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় সময়মতো কাজ হয় না, যা বিকেন্দ্রীকরণ করা জরুরি।
গবেষণায় দেখা গেছে, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের হাসপাতালে ল্যাব পরীক্ষার সেবা প্রাপ্তির হার বেশি হলেও বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোর ক্ষেত্রে বৈষম্য বিদ্যমান। সব পর্যায়ের হাসপাতালেই জরুরি ওষুধের সংকট রয়েছে। নাগরিকেরা প্রয়োজনীয় সেবা পাচ্ছেন না, অথচ হাসপাতালগুলো তাদের বাজেটের ৮৫ শতাংশের বেশি ব্যয় করতে পারছে না।
দেশের আটটি বিভাগের ২২টি হাসপাতালের ওপর এই গবেষণা পরিচালিত হলেও এতে সরকারি স্বাস্থ্যসেবার সামগ্রিক চিত্র ফুটে উঠেছে। গবেষণা দলের প্রধান ও পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান যথার্থই বলেছেন, "স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নয়; বরং বরাদ্দের অর্থকে কার্যকর স্বাস্থ্যসেবায় রূপান্তর করার সক্ষমতা গড়ে তোলাই জরুরি।"
এই গবেষণা স্বাস্থ্য খাতের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার সংস্কারের প্রয়োজনীয়তাকে আবারও সামনে আনল। আশা করা যায়, গবেষণাপত্রে উল্লিখিত সুপারিশগুলো সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে। নাগরিকদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা যতটা না আর্থিক সক্ষমতার বিষয়, তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রশ্ন।