জুন মাস। সিলেটের খাদিমনগরে শুকতারা রিসোর্টের একটি কটেজের ব্যালকনিতে বসে আছি। ব্যালকনির কোলে লম্বা একটি বনাকগাছ—ফুল ফুটেছে, আর ঘন পাতার আড়ালে ফুলগুলো যেন খেলছে লুকোচুরি। সকালে ওই গাছটার তলায় না গেলে হয়তো বুঝতাম না, ঝরা ফুলগুলোর সৌন্দর্য কতটা চোখে পড়ে। গাছটা আবার কোলেরও খুব কাছে।

দুপুরের একটু আগে হঠাৎ ঝুম বৃষ্টি এল। টিলার ওপরে বসে মেঘলা আকাশ, হালকা হেলে নামা ঢলো ঢলো বৃষ্টিধারা, ঘোলাটে সবুজ—আর দূরের আবছা পাহাড়—সব মিলিয়ে দৃশ্যটা যেন একরকম ধাঁধা তৈরি করল। ব্যালকনির ওপরে বসে নিচের ঝোপঝাড়ের গাছপালা দেখছিলাম। মনে হলো, লনের প্রান্তে কিছু অচেনা-অজানা গাছ আছে। তবে আর ভালো করে দেখা হলো না। উঠে ঘরে চলে এলাম। বৃষ্টি কিছুক্ষণ চলল। আর তারপর থেকেই মনের মধ্যে খচ খচ করতে লাগল—অচেনা গাছটাকে অন্তত একবার চোখে দেখা দরকার।

বৃষ্টি থামতেই নিচে নেমে জলছপছপ লনের ঘাসে পা ডুবিয়ে সেই গাছটার কাছে গেলাম। কুলাঞ্জনের মতোই একটি বড় ঝোপের পাশে দাঁড়ালাম। পাশ কাটিয়ে সামনের দিকে এগোতেই মনটা আনন্দে নেচে উঠল—টক আতা। গাছে গাছে ঝুলছে কয়েকটা বড় বড় টক আতা ফল। আগে কখনো এর স্বাদ পাইনি। ঝড়বাদলে এবার মনে হয় সেই স্বাদটা টের পাওয়ার সুযোগ হলো—জোর হাওয়ার ঝাপটায় একটি প্রায় পেকে আসা ফল গাছের তলায় পড়ে আছে। কুড়িয়ে নিলাম, ছবি তুললাম। পরদিন টিপে দেখলাম ফলটা নরম হয়েছে। তাই ওখানেই খেয়ে ফেললাম।

ভেতরে আতার মতোই সাদা শাঁস আছে, তবে আতার মতো নোনতা মিঠে নয়—টকটা স্পষ্ট। নরম শাঁসের ভেতর আরও কিছু চকলেট রঙের বিচি পেলাম। তবে সবকিছুর চেয়ে যেটা সবচেয়ে বেশি টানল, তা স্বাদের চেয়ে ঘ্রাণ। এক ফলের মধ্যে যেন তিন ফলের ঘ্রাণ—আম, স্ট্রবেরি ও আনারস!

ঢাকায় বাসায় ফিরে দেখি, আমার এক প্রতিবেশী বাসার ছাদে একটি টক আতার গাছ লাগিয়েছেন—আগে সেটা তেমনভাবে খেয়াল করিনি। ড্রামের ভেতরও গাছটা বেশ বড় হয়েছে, তবে ফল নেই। এরপর কিছুদিন পর খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ হলে সেখানকার কৃষি অনুষদের অধ্যাপক ড. মনিরুল সঙ্গে নিয়ে গেলেন তাঁদের গবেষণা মাঠে। সেখানে ওটগাছ দেখতে গিয়ে দেখি কয়েকটা টক আতার গাছ—আকারে শুকতারা রিসোর্টে লাগানো গাছগুলোর চেয়ে বেশ বড়। অনেকগুলো ডালে ফল ঝুলছে, কিন্তু ফলগুলো তখনও কচি। মনিরুল ভাই বলেন, ‘গবেষণা মাঠ বলে রক্ষে। না হলে এসব গাছের একটা পাতাও রাখতে পারতাম না। এর পাতা নাকি ক্যানসার সারাতে পারে, ফেসবুকে এ রকম কথা চাউর হওয়ার পর এ গাছের কদর বেড়েছে। কেউ মনে হয় টক আতা নামটা জানে না, সবাই জানে করোসলগাছ।’

ইন্টারেস্টিং তো বটেই। ক্যানসারের ওষুধ নিয়ে বিজ্ঞানীরা যখন খুঁজছেন, সেখানে করোসলপাতা ক্যানসার সারাবে—এই কথায় কৌতূহল বাড়ল। তাই এ বিষয়ে গবেষণা-ফল খুঁজতে শুরু করলাম। তবে কোথাও এমন কোনো তথ্য পেলাম না—যেখানে সরাসরি বলা আছে যে টক আতা ওরফে করোসলগাছ ক্যানসার প্রতিরোধ করতে বা সারাতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ঔষধ প্রশাসন এবং স্বাস্থ্য সংস্থাগুলো ক্যানসার চিকিৎসার জন্য করোসলকে অনুমোদন করে না। তবে টক আতার পুষ্টিগুণ দেহের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে—এটুকু বলা থাকে।

বিদেশি ফল এই টক আতার কথাও কিছুটা ভুলে গিয়েছিলাম। কিন্তু এ বছর ১ আগস্টে লেখক জায়েদ ফরিদ ভাইকে নিয়ে ছাদে গিয়ে দেখলাম—গাছটায় ফল ধরেছে। ফল বেশ বড় হয়েছে, এখনো পাকেনি।

টক আতা একটি ফলের গাছ, যার ইংরেজি নাম সাওয়ারসপ ও প্রজাতিগত নাম Annona muricata এবং গোত্র অ্যানোনেসি। এটি আতা ও শরিফা গোত্রেরই গাছ, তবে ভিন্ন প্রজাতি। ছোট আকারের বৃক্ষ, কাণ্ড মসৃণ, কচি ডালগুলো রোমশ। পাতা মসৃণ, চকচকে, সবুজ, কিনারা মসৃণ বা অখণ্ড, অগ্রভাগ সুচালো, আয়তাকার থেকে ডিম্বাকার। পাতার নিচের পিঠ অনুজ্জ্বল ও সূক্ষ্ম রোমশ। ফল আতার মতো গোলগাল না, কিছুটা বাঁকানো হৃৎপিণ্ডাকার ও খোসা কাঁটায় ভরা। কাঁচা ফলের রং সবুজ, পাকলে হলুদাভ সবুজ হয়। মেক্সিকো থেকে আসা এ ফলের গাছ বসতবাড়ির বাগানে লাগানো যায়। পাকা ফলের শাঁস দিয়ে আইসক্রিম ও ডেজার্ট বানানো যায়।

মৃত্যুঞ্জয় রায়, কৃষিবিদ ও প্রকৃতিবিষয়ক লেখক