চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর মোহনায় দাঁড়ালে প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন, মাছ ধরার জালের টুকরা ও নানা ধরনের বর্জ্যে ভরা এক বিষণ্ন দৃশ্য চোখে পড়ে। তবে দৃশ্যমান এই দূষণের চেয়েও গভীর এক সংকট দানা বাঁধছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, প্লাস্টিক ভেঙে তৈরি হওয়া অতি ক্ষুদ্র মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন কেবল কর্ণফুলীর পানি বা তলদেশেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা হালদা নদীর মাছের শরীরেও প্রবেশ করেছে। অর্থাৎ, দূষণ এখন নদীর সীমানা ছাড়িয়ে মানুষের খাদ্যচক্রের দিকে অগ্রসর হচ্ছে, যা পরিবেশগত বিপর্যয়ের পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য ও খাদ্যনিরাপত্তার জন্য এক গুরুতর সতর্কবার্তা।
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের অর্থনীতির প্রাণ কর্ণফুলী নদী। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর, অসংখ্য শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং লাখো মানুষের জীবিকা এই নদীকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত। অথচ বর্তমানে এই গুরুত্বপূর্ণ নদীটি নগরের বর্জ্যের শেষ গন্তব্যে পরিণত হয়েছে। গবেষণায় উঠে এসেছে যে, কর্ণফুলীর পানি এবং তলদেশের পলিতে উদ্বেগজনক মাত্রায় মাইক্রোপ্লাস্টিক জমা হয়েছে। বিশেষ করে নদীর নিম্নপ্রবাহে, যেখানে শিল্পাঞ্চল, বন্দর ও নগরজীবনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি, সেখানে দূষণের মাত্রা সর্বোচ্চ।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, বিশ্বের একমাত্র প্রাকৃতিক জোয়ার-ভাটানির্ভর কার্পজাতীয় মাছের প্রজননক্ষেত্র হালদা নদীতেও একই ধরনের দূষণ ছড়িয়ে পড়েছে। গবেষণায় পরীক্ষিত প্রতিটি মাছের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। এই কণাগুলো শুধু পরিপাকতন্ত্রেই নয়, মানুষের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত মাছের পেশিতেও শনাক্ত হয়েছে। এর অর্থ হলো, প্লাস্টিক দূষণ এখন আর কেবল পরিবেশগত সমস্যা নয়, বরং তা মানুষের খাবারের অংশ হয়ে ওঠার বাস্তব ঝুঁকি তৈরি করেছে।
গবেষকদের মতে, এই দূষণের মূল উৎস হলো মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, শিল্পকারখানার বর্জ্য, অপরিশোধিত নর্দমার পানি, মাছ ধরার জাল, সিনথেটিক কাপড়ের তন্তু এবং প্লাস্টিকজাত পণ্যের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার। কর্ণফুলীর ক্ষেত্রে নগরের খাল-নালা হয়ে এসব বর্জ্য নদীতে পড়ছে এবং হালদার ক্ষেত্রে শাখা খাল, উজানের জনবসতি ও গৃহস্থালি বর্জ্য একই বিপদ সৃষ্টি করছে। এটি মূলত একটি অববাহিকাভিত্তিক সমস্যা, যার সমাধান হতে হবে সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. মনজুরুল কিবরীয়ার মতে, "মাইক্রোপ্লাস্টিক শুধু নিজেই দূষক নয়; এটি ভারী ধাতু ও বিষাক্ত রাসায়নিক বহন করে জলজ প্রাণীর শরীরে প্রবেশ করতে পারে।"
অন্যদিকে, কর্ণফুলী নিয়ে দীর্ঘকাল গবেষণা করা অধ্যাপক ইদ্রিস আলীর মতে, "দূষণ যখন মাছের শরীরে পৌঁছে যায়, তখন তা জীববৈচিত্র্য, মৎস্যসম্পদ এবং খাদ্যনিরাপত্তা—তিন ক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলে।"\ তাই একে কেবল পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি সরাসরি জনস্বাস্থ্যের সাথে জড়িত।
এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে এই অদৃশ্য সংকট একসময় দৃশ্যমান বিপর্যয়ে পরিণত হবে। শিল্পকারখানার বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি) কার্যকরভাবে পরিচালনা নিশ্চিত করতে হবে এবং সেগুলোকে এমন প্রযুক্তিতে উন্নীত করতে হবে, যাতে মাইক্রোপ্লাস্টিকও আটকে রাখা সম্ভব হয়। পাশাপাশি নদীতে প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলা বন্ধ করতে কঠোর আইন প্রয়োগ, নগরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন এবং নিয়মিত পরিবেশগত নজরদারি নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।