এ সপ্তাহের শুরুতে মরক্কো থেকে স্পেনের আফ্রিকা মহাদেশে অবস্থিত এনক্লেভ সেউতায় প্রবেশের চেষ্টা করতে গিয়ে অন্তত ৭২ জন অভিবাসীর মৃত্যু হয়েছে। মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে হাজার হাজার মানুষ সেউতায় প্রবেশ করে, যাকে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতার লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করেছেন।
সংবাদমাধ্যমের সাক্ষাৎকারে অনেক অভিবাসী জানিয়েছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন পোস্ট তাঁদের এই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় উৎসাহিত করেছে। এই ঘটনার পর জাতিসংঘে ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ড্যানি দানন দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, "স্পেন ইসরায়েলকে উপদেশ দিতে পিছপা হয় না, অথচ সেউতার অভিবাসন–সংকটের পর নিজেরাই জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে।"
উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক সময়ে সানচেজ সরকার ইসরায়েলের প্রতি কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। স্পেন ইসরায়েলকে গণহত্যাকারী রাষ্ট্র হিসেবে আখ্যায়িত করার পাশাপাশি বড় ধরনের অস্ত্রচুক্তি বাতিল করেছে এবং ২০২৪ সালে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েছে। সেউতার ঘটনার পর ইসরায়েল স্পেনকে ভণ্ডামির অভিযোগে অভিযুক্ত করতে শুরু করে। ড্যানি দানন প্রশ্ন তোলেন, "স্পেন আগে অন্যদের উপদেশ দেওয়ার আগে ব্যাখ্যা করুক, কেন তারা এখনো আফ্রিকায় ঔপনিবেশিক এনক্লেভ ধরে রেখেছে।"
তবে বিশ্লেষকদের মতে, ঔপনিবেশিকতার অভিযোগ তোলার ক্ষেত্রে ইসরায়েলের অবস্থানই বেশি প্রশ্নবিদ্ধ। গাজা উপত্যকায় ফিলিস্তিনিদের ওপর গণহত্যা এবং পশ্চিম তীরে দীর্ঘদিনের দখলদারির মাধ্যমে কার্যত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড গ্রাস করার চেষ্টা করছে ইসরায়েল। অথচ তারা এমন এক উল্টো বাস্তবতা প্রচার করে, যেখানে নিহত ফিলিস্তিনিদের সন্ত্রাসী হিসেবে উপস্থাপন করা হয় এবং হামলাকারীরা নিজেদের ভুক্তভোগী বলে দাবি করে।
সেউতা ও মেলিলা—এই দুই স্পেনীয় এনক্লেভকে মরক্কো নিজেদের দাবি করে। ২০২০ সালে আব্রাহাম চুক্তির মাধ্যমে মরক্কো ও ইসরায়েলের সম্পর্ক স্বাভাবিক হয় এবং বর্তমানে দুই দেশের সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ।
ড্যানি দাননের মন্তব্যের জবাবে স্পেনের পরিবহনমন্ত্রী অস্কার পুয়েন্তে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, "এখন সবকিছুই অনেকটা পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে।" তাঁর এই মন্তব্যের মাধ্যমে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, স্পেনের ইসরায়েলবিরোধী অবস্থানের কারণে সেউতায় অভিবাসীদের ঢল নামানোর পেছনে ইসরায়েলের ভূমিকা থাকতে পারে।
এই ধারণা আরও জোরালো হয় কিছু ইসরায়েলপন্থী কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকের বক্তব্যে। গত মার্চ মাসে সাবেক পেন্টাগন কর্মকর্তা মাইকেল রুবিন এক লেখায় মত দেন যে, মরক্কোর লোকজনের বুলডোজার নিয়ে সীমান্তে জড়ো হয়ে নিরস্ত্র অবস্থায় সেউতা ও মেলিলায় ঢুকে মরক্কোর পতাকা উত্তোলন করা উচিত।
অন্যদিকে, ইসরায়েলের একটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত লেখায় আমিন আইয়ুব প্রস্তাব দেন, ইসরায়েল যেন মরক্কোকে সেউতা ও মেলিলা পুনর্দখলে সাহায্য করে। তাঁর মতে, সময়টি উপযুক্ত ছিল কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও স্পেনের সম্পর্ক তখন উত্তেজনাপূর্ণ ছিল। স্পেন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত যুদ্ধে সহযোগিতা করতে অনাগ্রহ দেখিয়েছিল।
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুদ্ধ শুরু হলে স্পেন যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দেয়নি। এর ফলে পরের মাসে এমন খবর প্রকাশিত হয় যে, যুক্তরাষ্ট্র স্পেনকে ন্যাটো থেকে সাময়িকভাবে স্থগিত করার প্রস্তাব বিবেচনা করেছে। আমিন আইয়ুব আরও উল্লেখ করেন, আব্রাহাম চুক্তি মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার জোটকাঠামোকে নতুনভাবে সাজানোর সুযোগ তৈরি করেছে, যা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের স্বার্থ রক্ষা করে।
সেউতার সাম্প্রতিক ঘটনায় ইসরায়েলের সরাসরি সম্পৃক্ততা এখনো স্পষ্ট নয়, তবে ইতিহাস বলে অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে গোপনে হস্তক্ষেপ করতে ইসরায়েল কখনো বিরত থাকেনি।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সেউতার ঘটনাকে সানচেজ সরকারের অদক্ষতার প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করে সতর্ক করেছেন যে, ভুল দল ক্ষমতায় এলে যুক্তরাষ্ট্রেও একই পরিস্থিতি তৈরি হবে।
ইসরায়েল হয়তো চেয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র সেউতাকে মরক্কোর অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানাবে, কিন্তু ট্রাম্প অভিবাসন নিয়ে ভীতি তৈরির রাজনীতিতেই বেশি মনোযোগ দিয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে ইসরায়েল স্পেনের কথিত দ্বৈত মানদণ্ড নিয়ে সমালোচনা চালিয়ে নিজেদের কার্যকলাপ থেকে দৃষ্টি সরানোর চেষ্টা করছে। তবে সামগ্রিকভাবে বলা যায়, ইসরায়েলের ভণ্ডামির কোনো সীমা নেই।
—বেলেন ফার্নান্দেজ, গবেষক ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের কলাম লেখক।