চট্টগ্রামের কুখ্যাত সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমন মাসে গড়ে এক কোটি টাকা চাঁদা আদায় করতেন। এই বিপুল অর্থের অর্ধেক চলে যেত বিদেশে পলাতক তার গুরু সাজ্জাদ আলীর কাছে এবং বাকিটা তিনি নিজের কাছে রাখতেন। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের পর পুলিশের কাছে এই তথ্য স্বীকার করেছেন ইমন।
পুলিশি তদন্তে জানা গেছে, ইমনের দল প্রথমে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের জীবনবৃত্তান্ত সংগ্রহ করত। এরপর নির্দিষ্ট ব্যবসায়ীর ব্যবসার খুঁটিনাটি এবং পরিবারের সদস্যদের তথ্য সংগ্রহ করা হতো। সব তথ্য হাতে পাওয়ার পর বিদেশি নম্বর থেকে ব্যবসায়ীকে ফোন করে গুলি করা এবং পরিবারের সদস্যদের ক্ষতি করার হুমকি দেওয়া হতো। দাবি অনুযায়ী টাকা না দিলে ব্যবসায়ী বা তাদের প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য করে গুলি চালানো হতো।
গত ২৯ জুলাই সকালে যশোর থেকে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পথে তিন সহযোগীসহ গ্রেপ্তার হন ইমন। তার বিরুদ্ধে অন্তত ১৫টি মামলা রয়েছে। গতকাল রোববার আদালত তাকে ফটিকছড়ি থানার হত্যা ও অস্ত্র মামলায় ১০ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করলে জেলা পুলিশ তাকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে।
জিজ্ঞাসাবাদে ইমন তার চাঁদা আদায়ের কৌশল বিস্তারিত জানিয়েছেন। পুলিশ সদস্যরা জানান, তিনি সহযোগীদের মাধ্যমে ব্যবসায়ী ও প্রবাসীদের তালিকা তৈরি করতেন। নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে দীর্ঘ সময় অনুসরণ করা হতো এবং বিদেশি নম্বরের হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করে ফোন করা হতো। ফোনে ওই ব্যক্তির পোশাকের রঙের বর্ণনা দেওয়া হতো যাতে তিনি আতঙ্কিত হন। পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের পড়াশোনা ও চলাচলের বিস্তারিত তথ্য দিয়ে চাপ সৃষ্টি করা হতো। এরপরও টাকা না দিলে বাড়ি বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর কিংবা ফাঁকা গুলি ছোড়া হতো।
পুলিশ জানায়, ভুক্তভোগীরা ভয়ে মামলা না করায় এতদিন এই চাঁদাবাজির সঠিক হিসাব জানা যায়নি। অনেকে সমঝোতার মাধ্যমে টাকা দিয়ে দিতেন।
অতিরিক্ত চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার কাজী মোহাম্মদ তারেক আজিজ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "ইমন প্রতি মাসে গড়ে কোটি টাকা চাঁদা আদায় করতেন, যাঁদের বেশির ভাগই ব্যবসায়ী, প্রবাসী ও নির্মাণাধীন বহুতল ভবনের মালিক। কোটি টাকার মধ্যে ৫০ লাখ টাকা বিদেশে পলাতক তাঁর গুরু সাজ্জাদকে দিতেন। ১৫ লাখ টাকা তাঁর দলের লোকজনের জন্য খরচ করতেন। বাকি টাকা নিজে রাখতেন।"
তিনি আরও জানান, ইমনের দাবি তিনি সাজ্জাদকে সবচেয়ে বেশি টাকা দিতেন; রায়হান ও বোরহান তার চেয়ে বেশি দিতে পারতেন না। এই টাকা নগদে সংগ্রহ করে হুন্ডির মাধ্যমে সাজ্জাদের কাছে পাঠানো হতো। রিমান্ডে ইমন দাবি করেছেন, তার প্রায় হাজারের বেশি সহযোগী রয়েছে। পুলিশ বর্তমানে হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাঠানোর মাধ্যমগুলো শনাক্ত করার চেষ্টা করছে।
তবে ইমনের এই দাবি অস্বীকার করেছেন বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদ। আজ সোমবার দুপুরে মুঠোফোনে তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “ইমন এখন পুলিশের হেফাজতে আছেন। পুলিশ কত কথা বলবে।”
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ইমন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর এলাকার বাসিন্দা। তিনি দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে সবার বড়। তার বাবা মো. মুসা ওমানপ্রবাসী ছিলেন, যিনি কয়েক বছর আগে মারা যান। স্থানীয়দের মতে, ছাত্রজীবন থেকেই ক্রিকেটে আগ্রহী ছিলেন ইমন। তিনি চট্টগ্রাম ব্রাদার্স একাডেমিতে খেলতেন এবং কাজীর দেউড়ি স্টেডিয়ামে অনুশীলন করতেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বড় সাজ্জাদের দলে যুক্ত হন ইমন। গত বছরের ১৫ মার্চ ছোট সাজ্জাদ গ্রেপ্তার হওয়ার পর তিনি বড় সাজ্জাদের অন্যতম সহযোগী হয়ে ওঠেন। ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ বাকলিয়া এলাকার জোড়া খুন এবং ২৩ মে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে সন্ত্রাসী ঢাকাইয়া আকবর হত্যাসহ বিভিন্ন ঘটনায় আলোচিত হন তিনি।
পুলিশের ভাষ্যমতে, ইমন ১৫ থেকে ২০টি আগ্নেয়াস্ত্র বহন করতেন এবং অস্ত্র ব্যবহারে অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন। বাকলিয়ার জোড়া খুনের ঘটনায় সন্ত্রাসী ও মোটরসাইকেল সংগ্রহের দায়িত্ব তার ছিল। বর্তমানে চট্টগ্রামে বড় সাজ্জাদের হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন ইমন ও মোহাম্মদ রায়হান। পুলিশের দাবি, বড় সাজ্জাদের বাহিনীতে অন্তত ৫০ জন শুটার ও সহযোগী সক্রিয় রয়েছেন, যাদের মাধ্যমে নিয়মিত চাঁদা আদায় করা হতো। বিশেষ করে ইমনের ফোনে দেওয়া হুমকি চট্টগ্রামবাসীর জন্য আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।