একসময় জামালপুরের যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, ঝিনাই, দশআনী ও সুবর্ণখালী নদী ছিল দেশীয় মাছের অন্যতম উৎস। সারা বছর এসব নদীতে নানা প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত, যা ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন হাজারো জেলে। তবে বর্তমানে পরিবেশগত পরিবর্তন, অবৈধ জালের ব্যবহার এবং প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস হওয়ার কারণে দেশীয় মাছের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। এর ফলে চরম জীবিকা সংকটে পড়েছেন জেলার ২১ হাজার ৩১৮ জন নিবন্ধিত জেলে।
জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার গুঠাইল এলাকার জেলে জলধর নমশূদ্রের জীবন এখন চরম অনিশ্চয়তার। তিন কন্যাসন্তানের জনক জলধর প্রতিদিন ভোরেই সঙ্গীদের সঙ্গে যমুনা নদীতে যান এই আশায় যে, মাছ বিক্রি করে অন্তত পরিবারের খাবার জুটবে। কিন্তু দীর্ঘক্ষণ জাল টেনেও তার জালে ওঠে মাত্র ১০০ থেকে ২০০ টাকার মাছ। এই সামান্য অর্থ দিয়ে সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দেওয়া নাকি বাজারে বিক্রি করা—প্রতিদিনই এমন দোটানায় থাকেন তিনি। জলধরের এই করুণ পরিস্থিতি যেন জেলার হাজারো নদীনির্ভর জেলে পরিবারের বর্তমান বাস্তবতারই প্রতিফলন।
জলধর নমশূদ্র আফসোস করে বলেন, "একটা খেও দিতে এক-দেড় ঘণ্টা সময় লাগে। অথচ মাছ ওঠে ১০০-১৫০ টাকার। ৫০-৬০ হাজার টাকা খরচ করে জাল-নৌকা কিনেছি। এগুলো বিক্রি করব নাকি নিজে খাব? আমার আর পোষায় না। তিনটে মেয়ে আছে, তাদের পড়াশোনা আর সংসারের খরচ আছে। এই ১০০-১৫০ টাকা দিয়ে মেয়েগুলোকে কীভাবে বিয়ে দেব? নদীতে মাছ নেই, দিনদিন কমে যাচ্ছে। পানি আছে, কিন্তু আগের মতো মাছ নেই।"
জেলার অধিকাংশ জেলের অবস্থাই এখন একই রকম। যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র তীরের জেলেরা জানান, কয়েক বছর আগেও যেসব মাছ সহজলভ্য ছিল, এখন সেগুলোর অনেক প্রজাতিই বিরল হয়ে গেছে। ৩৫ বছর ধরে মাছ ধরার অভিজ্ঞ জেলে জগন্নাথ নমশূদ্র বলেন, "আগে বাতাসি, বউমাছ, চিংড়ি, বাঁশপাতারি প্রচুর পাওয়া যেত। এখন এসব মাছ দেখাই যায় না। নদীতে মাছ নেই, মানুষের পাতেও নেই।"
জীবিকার এই সংকটে অনেক জেলে বাধ্য হয়ে পেশা পরিবর্তন করছেন। কেউ মাছের ব্যবসায়, কেউ দিনমজুরিতে যুক্ত হয়েছেন, আবার অনেকে গ্রাম ছেড়ে ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে পাড়ি জমিয়েছেন। ইসলামপুরের মাছ ব্যবসায়ী নিতাই নমশূদ্র জানান, নদীর মাছ দিয়ে আর সংসার চলে না, তাই বাধ্য হয়ে পুকুরের চাষের মাছ কেনাবেচা করে কোনোমতে জীবন অতিবাহিত করছেন।
স্থানীয় জেলেদের অভিযোগ, অবৈধ কারেন্ট জাল, চায়না দুয়ারি ও সূক্ষ্ম ফাঁসের জালের কারণে প্রতিদিন মাছের পোনা ও ডিম ধ্বংস হচ্ছে। পাশাপাশি নদীর নাব্যতা হ্রাস, পানিদূষণ ও বিভিন্ন স্থানে বাঁধ নির্মাণের ফলে মাছের প্রজননক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে পড়েছে। জেলে নিরঞ্জন চন্দ্র দাস বলেন, "২০-৩০ বছর আগে যেসব মাছ ধরে খেয়েছি, সেগুলো এখন আর পাওয়া যায় না। বড় বড় বেড়জাল দিয়ে মাছ ঘিরে ফেলা হয়। ৫০টি মাছ উঠলে দেখা যায় দেড় লাখ পোনা নষ্ট হচ্ছে। এরা এই নেটজাল, চায়না জাল ও কেমিক্যাল ব্যবহার করে দেশের ক্ষতি করছে।"
বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. আব্দুস সাত্তার জানান, জলাশয়ের গভীরতা কমে যাওয়া এবং পানি শুকিয়ে যাওয়ার ফলে প্রাকৃতিক মাছের আবাস্থল নষ্ট হচ্ছে। এছাড়া বিভিন্ন স্থানে বাঁধ দেওয়ার কারণে মাছ স্রোতশীল পরিবেশ পায় না, যা প্রজননের সুযোগ কমিয়ে দেয়। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, কৃত্রিম খাবার ও পরিবেশগত ভারসাম্যের অভাবের কারণে চাষের মাছের স্বাদ প্রাকৃতিক মাছের মতো হয় না।
জামালপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আ ন ম আশরাফুল কবীর জানান, বাংলাদেশের ২৬১টি দেশীয় প্রজাতির মাছের মধ্যে প্রায় ৬০টি প্রজাতি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। তিনি বলেন, "মাছের প্রজনন ও সংরক্ষণে জেলার সাতটি উপজেলায় সাতটি অভয়াশ্রম রয়েছে। ব্রহ্মপুত্র নদীতে দুটি স্থায়ী অভয়াশ্রম নির্মাণের কাজ চলছে এবং ভবিষ্যতে প্রতিটি উপজেলায় অভয়াশ্রম গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।"
তিনি আরও জানান, অবৈধ জাল বন্ধ করা, প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা নিয়ন্ত্রণ ও অভয়াশ্রম সম্প্রসারণের মাধ্যমে দেশীয় মাছ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। সবার সহযোগিতা পেলে হারানো মাছ উদ্ধার সম্ভব বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জামালপুরের ২১ হাজার ৩১৮ জন নিবন্ধিত জেলের এই সংকট শুধু তাদের জীবিকাকেই নয়, বরং নদীকেন্দ্রিক লোকজ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকেও হুমকির মুখে ফেলেছে। কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে দেশীয় মাছের পাশাপাশি এই প্রাচীন পেশাটিও বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে।