বাংলাদেশের মতো গভীরভাবে বিভক্ত সমাজে রিকনসিলিয়েশন বা পুনঃসমঝোতার পথ এক দিনে তৈরি হয় না। শুধু সময় নয়, নানা পক্ষের মতের পার্থক্য, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং সামাজিক সম্পর্কের টানাপোড়েন মিলিয়ে বিষয়টি জটিল। তবে রিকনসিলিয়েশন প্রসঙ্গে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে কাজটি শুরু হতে পারে, তা হলো রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে বিভিন্ন দলের মতের মানুষের মধ্যে সহাবস্থান ও সহনশীলতার চর্চার সংস্কৃতি গড়ে তোলা—যা দীর্ঘমেয়াদে বিভাজন কমাতে সহায়ক হতে পারে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর হতে চলল। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ ও নয়া বন্দোবস্তের স্বপ্নে বিভোর সাধারণ মানুষ অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে আকাশচুম্বী প্রত্যাশা করেছিলেন। সেই প্রত্যাশা কতখানি ধারণ করা গেছে—এ নিয়ে নানা তর্কবিতর্কও চলমান।

সমাজকে কীভাবে একটি সহনশীল ও সর্বজনীন অবস্থানে এগিয়ে নেওয়া যায়—এ প্রশ্নটি গুরুত্ব পাচ্ছে বিভিন্ন গণমাধ্যম, সভা-সেমিনার ও আলোচনায়। বিদ্যায়তনিক পরিসরেও ক্রান্তিকালীন ইনসাফের প্রায়োগিক দিকগুলো নিয়ে বিশ্লেষণের প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে। এই প্রেক্ষাপটে রাউটলেজ প্রকাশনীর একটি গবেষণা-উদ্যোগের অংশ হিসেবে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ও বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ক্রান্তিকালীন ইনসাফের অন্যতম একটি পদ্ধতি ‘রিকনসিলিয়েশন’ বা ‘পুনঃসমঝোতা’র সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে একটি পর্যালোচনার চেষ্টা করা হয়েছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়েছে। সেই কথোপকথনগুলো জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশে রিকনসিলিয়েশনের সম্ভাবনাকে বুঝতে সহায়ক হয়েছে—একাধিক মাত্রায় এবং তুলনামূলকভাবে নির্মোহ দৃষ্টিকোণ থেকে।

আলাপটা যদিও বাংলাদেশে অপেক্ষাকৃত নতুন, তবু ক্রান্তিকালীন ইনসাফ ও তার একটি পদ্ধতি হিসেবে ‘রিকনসিলিয়েশন’ ধারণাটি আন্তর্জাতিকভাবে মোটেও অপরিচিত নয়। ১৯৭৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৪০টির বেশি দেশে এ ধরনের কমিশন গঠিত হয়েছে। সহিংসতা-উত্তর পরিস্থিতিতে আনুষ্ঠানিক কিংবা অনানুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ হিসেবেও বিভিন্ন দেশে নানা রকম অভিজ্ঞতা দেখা যায়। সাধারণভাবে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় হলেও উদ্দেশ্য পূরণ, কাঠামো নির্মাণ এবং সমাজে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি—এই তিনটি ক্ষেত্রেই নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

ক্রান্তিকালীন ইনসাফের ক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রচলিত পদ্ধতি হলো আদালতে বিচারের মাধ্যমে অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করা। কিন্তু বিভিন্ন দেশের কেসস্টাডি বিশ্লেষণে দেখা যায়, কেবল বিচারের ওপর জোর দিলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও তাঁর পরিবারের ভেতর সন্তুষ্টি আসতে পারে—তবে একই সমাজে বসবাসকারী অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত হওয়ায় রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের মধ্যে পুনরায় সহাবস্থান প্রতিষ্ঠা সব ক্ষেত্রে নিশ্চিত হয় না। এই বাস্তবতা থেকেই অনেক দেশে বিচারপ্রক্রিয়ার পাশাপাশি ‘ট্রুথ ও রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ গঠনের মাধ্যমে সমাজের বিস্তৃত সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভাজন কমানোর প্রচেষ্টা থাকে।

বাংলাদেশেও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ঘোষিত বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ইশতেহারে রাজনৈতিক ঐক্য, সমঝোতা ও নিরাময়ের প্রসঙ্গ এসেছে নানা ভাষায় ও পরিসরে। তবে যে জায়গায় আলোচনা সীমিত হয়ে পড়ে, তা হলো—ইশতেহারগুলোতে মূলত বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংঘটিত অপরাধের বিচার, ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের মাধ্যমে বর্তমান বাংলাদেশে ঐক্য প্রতিষ্ঠার কথাই বেশি উচ্চারিত হয়েছে।

এ ধরনের প্রতিশ্রুতি বিশ্লেষণে দুটি প্রশ্ন সামনে আসে। প্রথমত, রিকনসিলিয়েশন বা পুনঃসমঝোতা বলতে রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে যে ধারণা তুলে ধরা হয়েছে, তা প্রক্রিয়ার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক বোঝাপড়ার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ। দ্বিতীয়ত, আওয়ামী লীগ আমলে সংঘটিত সাড়ে ১৫ বছরের অপরাধ-অভিযোগের সুরাহা করা যেমন প্রয়োজন, তেমনি শুধু এই আমলের হিসাব-নিকাশ করলেই কি বাংলাদেশের ঐতিহাসিক সব বিভেদ-বিভাজন কার্যকরভাবে মুছে ফেলা সম্ভব? পূর্ববর্তী আমলে সংঘটিত নানা অমীমাংসিত অধ্যায়গুলোর যুক্তিসংগত বিহিত না করে, কেবল সাড়ে ১৫ বছরের অন্যায়-অবিচারের ‘মীমাংসা’ করে দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের মতো গভীরভাবে বিভক্ত সমাজে রিকনসিলিয়েশন বা পুনঃসমঝোতা প্রতিষ্ঠা সফল হবে কি না—এই প্রশ্নও অনিবার্য।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমল থেকেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাই অভ্যুত্থানসহ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংঘটিত গুমের মামলা পরিচালিত হচ্ছে এবং ইতিমধ্যে কিছু মামলার রায়ও দেওয়া হয়েছে। বিচারপ্রক্রিয়া যেহেতু চলছে তাই বিচারপ্রক্রিয়ার বাইরে বিদ্যমান বিভিন্ন দল ও গোষ্ঠীর মধ্যে কীভাবে রাজনৈতিক ও সামাজিক সহাবস্থান নিশ্চিত করা যায়, তার একটি রূপরেখা নির্ণয়ের আলোচনাই এখন অনেক বেশি জরুরি।

প্রথম প্রশ্নটির উত্তর খুঁজতে শুরুটা করা যায় নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি দেখেই। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন—এই সময়ের আগে দেওয়া ইশতেহারগুলোর দিকে তাকালে বোঝা যায়, রিকনসিলিয়েশন বা পুনঃসমঝোতা প্রতিষ্ঠায় দলগুলো কী ধরনের কমিশনের কথা বলছে।

সরকারি দল বিএনপি তাদের ৩১ দফায় ঘোষিত ‘ন্যাশনাল রিকনসিলিয়েশন কমিশন’-এর আলোকে নির্বাচনী ইশতেহারে ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক ও পুনর্বাসনমূলক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় একটি ‘ট্রুথ ও হিলিং কমিশন’ গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ইশতেহারে বলা হয় যে এই কমিশন গঠনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ আমলে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনগুলোর সত্য উদ্‌ঘাটন করাসহ যথাযথ প্রক্রিয়ায় অপরাধীদের জবাবদিহি ও শাস্তির আওতায় আনা হবে। একই সঙ্গে যাঁরা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাঁদের অর্থবহ ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা হবে।

বর্তমান বিরোধী দল—বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক ও পুনর্বাসনমূলক ‘ট্রুথ ও হিলিং কমিশন’ গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্তর থেকে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে টাস্কফোর্স গঠন ও জাতিসংঘ কর্তৃক কারিগরি সহায়তা গ্রহণের কথাও বলা হয়। ইশতেহারে আরও বলা হয়, এই উদ্যোগের মাধ্যমে গত ১৫ বছরে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রকৃত ঘটনা উন্মোচিত হবে, যা জাতীয় নিরাময় ও পুনর্মিলনের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে।

অপরদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে একটি ‘ট্রুথ ও রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ গঠনের কথা আলোচনা করেছে। বিএনপি ও জামায়াতের মতো তারাও আওয়ামী লীগ আমলের নানা সময়ে সংঘটিত অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিতের ওপর জোর দিয়েছে। তবে তাদের ইশতেহারের নতুন দিক হলো, নাৎসি-পরবর্তী জার্মানি ও বর্ণবাদ-পরবর্তী দক্ষিণ আফ্রিকার আদলে তারা ট্রুথ ও রিকনসিলিয়েশন কমিশন প্রতিষ্ঠার কথা বলেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর অবশ্য জার্মানিতে এমন মডেলের কোনো কমিশন গঠিত হয়নি, বরং নুরেমবার্গ ট্রায়ালের মাধ্যমে নাৎসিদের বিচারপ্রক্রিয়া পরিচালিত হওয়ার কথাই আমরা জানি।

এনসিপির ইশতেহারে উল্লেখযোগ্য আরেকটি দিক হলো প্রশাসন, বিভিন্ন বাহিনী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে আওয়ামী সমর্থক এবং সহযোগীদের মধ্যে যারা ফৌজদারি অপরাধে যুক্ত নয়, তাদের অপরাধ ও সম্পৃক্ততা স্বীকার ও ক্ষমা প্রার্থনা সাপেক্ষে সামাজিক ন্যায়বিচারের মাধ্যমে সমাজের মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি সেখানে দেওয়া হয়েছে।

এখানে স্বাভাবিকভাবেই একটি প্রশ্ন উঠতে পারে—নির্বাচনের পর ক্ষমতায় আসা বিএনপি বা জামায়াত-এনসিপি নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের এখন পর্যন্ত যে কার্যক্রম দেখা যাচ্ছে, তা কি ইশতেহারে বর্ণিত পরিণত রাজনৈতিক ভাবনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, নাকি এগুলো কেবল নির্বাচনের জন্য ইশতেহারে স্থান দেওয়া অলংকরণমূলক কিছু কথাবার্তা?

তবু প্রধান তিনটি রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহারে সত্য উদ্‌ঘাটনসহ ‘হিলিং’ ও রিকনসিলিয়েশনের জন্য কমিশন গঠনের যে উল্লেখ আছে, সেটিকে অগ্রগতিমূলক পদক্ষেপ হিসেবেই বিবেচনা করা যেতে পারে। এর আগে বাংলাদেশের অন্য কোনো নির্বাচনের আগে ক্রান্তিকালীন ইনসাফ নিয়ে এমন আলোচনা ব্যাপকভাবে দেখা যায়নি।

একটি ‘ট্রুথ ও পিস কমিশন’ কেন জরুরি। অন্তর্ভুক্তির আগে বিচার: ঐকমত্যের নামে দায়মুক্তি নয়। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর (২০২৫ সালের মে মাসে) জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার জন্য একটি ট্রুথ ও রিকনসিলিয়েশন কমিশন গঠনের কথা প্রথম উল্লেখ করেছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল। তিনি বলেছিলেন, ‘গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো ঘৃণ্য অপরাধীরা সংখ্যায় খুব বেশি নয়। তাদের উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা অবশ্যই করতে হবে। তারা (অপরাধীরা) যে এ জাতির মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন, সেটাকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য হলেও ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন করতে হবে।’ (মুক্তকণ্ঠ, ১০ মে ২০২৫)।

সাবেক এই উপদেষ্টাও রাজনৈতিক দলগুলোর মতোই কেবল আওয়ামী লীগ আমলে সংঘটিত অপরাধের বিচারের ওপর জোর দিয়েছিলেন। তাহলে প্রশ্ন থেকে যায়—এই দৃষ্টিকোণকে কেন্দ্র করে গঠিত কোনো কমিশনের মাধ্যমে সমাজের সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে রিকনসিলিয়েশন বা পুনঃসমঝোতার আলাপ সত্যিকার অর্থে শুরু হবে কি না। আর এ আলাপ এড়াতেই কি বিএনপি ও জামায়াত সচেতনভাবে ‘রিকনসিলিয়েশন’ শব্দটি এড়িয়ে গিয়ে শুধু ‘হিলিং’ শব্দটি ব্যবহার করেছে?

‘হিলিং’ বা নিরাময় ভিকটিমের পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের দিকেই বেশি গুরুত্ব দেয়—যা অবশ্যই প্রয়োজনীয়। কিন্তু ‘রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ বিচার ও পুনর্বাসনের পাশাপাশি সমাজের বিভেদ-বিভাজন হ্রাসে দীর্ঘমেয়াদি পথ তৈরি করতে পারত।

লক্ষণীয় হলো, সাবেক আইন উপদেষ্টা এবং তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ বাংলাদেশে ইউএনডিপির (জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি) আবাসিক প্রতিনিধি স্টেফান লিলারসহ একটি প্রতিনিধিদল নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা গিয়ে এ বিষয়ে ধারণা নিয়ে আসেন। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কমিশন গঠনে আর কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। একইভাবে, জাতীয় নির্বাচনের প্রায় ছয় মাস পার হলেও ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ‘রিকনসিলিয়েশন’ বা ‘হিলিং কমিশন’ গঠনের কোনো উদ্যোগও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান নয়।

আন্তর্জাতিক পর্যালোচনা অনুযায়ী ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন’ কমিশনের মূল উদ্দেশ্য শুধু অপরাধী শনাক্ত করা নয়; বরং অতীতের ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের সত্য উদ্‌ঘাটন, ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতার স্বীকৃতি, জবাবদিহি উৎসাহিত করা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের সহিংসতার পুনরাবৃত্তি রোধে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের সুপারিশ করার মাধ্যমে একটি সামগ্রিক (হলিস্টিক) প্রক্রিয়া পরিচালনা করাই এর অন্যতম কাজ। (প্রিসিলা হায়নার, ২০১১; জাতিসংঘ প্রতিবেদন ২০০৬)

অর্থাৎ এটি শুধু বিচার নয়, ন্যায়, স্বীকৃতি এবং সামাজিক পুনর্গঠনের একটি সম্মিলিত উদ্যোগ। উদাহরণ হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকায় ১৯৯৫ সালে গঠিত ট্রুথ ও রিকনসিলিয়েশন কমিশনকে উল্লেখ করা যায়। সেখানে লক্ষ্য ছিল অতীতের বর্ণবাদ ও রাজনৈতিক সংঘাতের বিভাজন অতিক্রম করে একটি ঐক্যবদ্ধ সমাজ গড়ে তোলা।

জনসমক্ষে শুনানির মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা এবং অপরাধীদের সাক্ষ্য নথিভুক্ত করার পাশাপাশি যাঁরা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপরাধের বিষয়ে সম্পূর্ণ সত্য প্রকাশ (ফুল ডিজক্লোজার) করেছিলেন, তাঁদের আইনের শর্ত পূরণ সাপেক্ষে ‘সাধারণ ক্ষমা’ করার ব্যবস্থাও করা হয় এই কমিশনের মাধ্যমে।[প্রমোশন অব ন্যাশনাল ইউনিটি অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন আইন ৩৪, ১৯৯৫, ধারা ২০(১-৩)]

এ ছাড়া কেনিয়ার ‘ট্রুথ, জাস্টিস অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ শুধু ব্যক্তিগত অপরাধ নয়, বরং ভূমিসংকট, জাতিগত বৈষম্য ও রাজনৈতিক সহিংসতার মতো দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সমস্যাও পর্যালোচনায় এনেছিল। কেনিয়ার কমিশনের উদ্দেশ্য ছিল বিভাজন সৃষ্টির সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণগুলো খুঁজে বের করা, যাতে ভবিষ্যতে সংঘাতের ঝুঁকি কমে। কমিশন ব্যাখ্যাও দিয়েছিল যে কেনিয়ায় নির্বাচন-সংক্রান্ত সহিংসতা পুনরাবৃত্তিমূলক ছিল এবং জাতিগত পরিচয়কে তৎকালীন রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছিল।

বিভিন্ন দেশে গঠিত এসব কমিশনের উদ্দেশ্য ও কর্মপরিধি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের প্রধান তিনটি রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লিখিত ‘ট্রুথ’, ‘রিকনসিলিয়েশন’ ও ‘হিলিং’ কমিশনের ব্যাপ্তি—সময়সীমা ও বিষয়বস্তু বিবেচনায়—তুলনামূলকভাবে সংকুচিতভাবে উপস্থাপিত হয়েছে।

বিচারপ্রক্রিয়া যখন চলছে, তখন বিচারপ্রক্রিয়ার বাইরে বিদ্যমান বিভিন্ন দল ও গোষ্ঠীর মধ্যে কীভাবে রাজনৈতিক ও সামাজিক সহাবস্থান নিশ্চিত করা যায়—তার একটি রূপরেখা নির্ণয়ের আলোচনাই বর্তমানে বেশি জরুরি। অন্তর্বর্তী সরকারের আমল থেকেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাই অভ্যুত্থানসহ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংঘটিত গুমের মামলা পরিচালিত হচ্ছে এবং ইতিমধ্যে কিছু মামলার রায়ও দেওয়া হয়েছে।

  • উম্মে ওয়ারা সহযোগী অধ্যাপক, ক্রিমিনোলজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

    মতামত লেখকের নিজস্ব