দেড় দশক ধরে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকার (২০০৯-২০২৪) নিচ থেকে উঠে আসা নানা চ্যালেঞ্জ ও সংকট সামলে নেওয়ার এক বিস্ময়কর ক্ষমতা দেখিয়েছিল। একের পর এক আন্দোলনকে তারা দমন বা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছিল—এমনকি এর মধ্যে ছিল বেশ কিছু অরাজনৈতিক আন্দোলনও, যেমন ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলন এবং কোটা সংস্কার আন্দোলন। দুটো আন্দোলনেরই নেতৃত্বে ছিল ‘জেন-জি’ প্রজন্ম। এসব আন্দোলন দমনে সরকার ব্যবহার করেছিল রাজনৈতিক মারপ্যাঁচ, পরিমিত ও হিসাবি সহিংসতা এবং এমন সব অঙ্গীকার—যা কখনোই বাস্তবায়ন করার কোনো ইচ্ছা শাসকগোষ্ঠীর ছিল না। ফলে প্রতিটি প্রতিবাদের সামনে দাঁড়িয়ে শাসনব্যবস্থাটি একধরনের ‘অ্যান্টি-ফ্র্যাজিলিটি’ বা ঘাতসহতা অর্জনে সক্ষম হয়; অর্থাৎ প্রতিটি অসন্তোষের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের দমন–পীড়নের হাতিয়ারগুলোকে তারা আরও ধারালো ও কঠোর করে তোলে।

এই প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের আগস্টের ঘটনাবলিকে শাসকদের অন্ধ অহংকার কিংবা ইতিহাসবিদ বার্বারা টাকম্যানের ভাষায় ‘মূর্খতার অভিযাত্রা’ বলা যেতে পারে। স্পষ্ট সতর্কবার্তা এবং বিকল্প থাকা সত্ত্বেও আত্মঘাতী নীতি অনুসরণ করে যাওয়ার ফল বলেই এটি ব্যাখ্যা করা যায়। নাসিম তালেবের ‘ব্ল্যাক সোয়ান’ তত্ত্ব দিয়েও দেখা যেতে পারে—যেখানে একটি ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ হলেও তার প্রভাব হয় সুদূরপ্রসারী ও অভাবনীয়। এসব দৃষ্টিভঙ্গির কোনোটিই পুরোপুরি ভুল নয়; তবে প্রতিটিই অনেকাংশে নির্ভর করে কোনো একক অহমিকা বা স্রেফ কাকতালীয় ভাগ্যের ওপর।

৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনকে আরও শক্ত ও বস্তুনিষ্ঠভাবে অনুধাবন করতে হলে বৃহত্তর রাজনৈতিক অর্থনীতির দিকে তাকাতে হবে। ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা গোষ্ঠী এবং তাদের মুখোমুখি হওয়া সামাজিক শক্তিগুলোর প্রণোদনা ও রাজনৈতিক সক্ষমতার কাঠামোগুলো বুঝতে হবে।

আওয়ামী লীগ দুই বছরে কতটা বদলাল—এটি একেবারে আলোচনার মাঝখানে চলে আসে। সরকারি চাকরিতে কোটাপদ্ধতির সংস্কার এবং মেধাভিত্তিক নিয়োগব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবিতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের হাত ধরে এই অভ্যুত্থানের সূচনা হয়েছিল। পরে একে কিছুটা সংকীর্ণ দৃষ্টিকোণ থেকে মধ্যবিত্ত শিক্ষার্থীদের একটি প্রতিবাদ হিসেবে দেখা হয়, যার চালিকা শক্তি ছিল চাকরি ও জীবিকার অনিশ্চয়তাজনিত উদ্বেগ। তবে এই ব্যাখ্যায় একটি চূড়ান্ত নির্ণায়ক দিক এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়: এই সংগ্রামে শহরের ‘প্রিক্যারিয়েট’ (অনিশ্চিত বা ভাসমান শ্রমজীবী জনগোষ্ঠী) এবং এক পর্যায়ে শিল্পকারখানার শ্রমিক শ্রেণির যোগদান।

খুব অল্প সময়ে এই গোষ্ঠীগুলো মিলে এক ক্ষণস্থায়ী কিন্তু পরাক্রমশালী ‘জনতা’ হিসেবে আবির্ভূত হয়। তাদের সম্মিলিত শক্তির মুখে সেনাবাহিনী জনতার ওপর গুলি চালাতে অস্বীকৃতি জানায়—এবং সেখানেই শাসনব্যবস্থার পতন ঘটে। এই পরিস্থিতি কীভাবে তৈরি হলো, তা বুঝতে হলে কাঠামো, এজেন্সি এবং অনির্ধারিত অনুঘটকের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া বুঝতে হবে।

কম মজুরি এবং ব্যাপক বেকারত্ব বহু দশক ধরে বাংলাদেশের তরুণসমাজকে তাড়া করে ফিরছে; কিন্তু সেই বৈষম্য এর আগে কখনোই এই মাত্রার গণবিস্ফোরণ ঘটাতে পারেনি। ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে সংগৃহীত জরিপ থেকে এর একটি আংশিক উত্তর পাওয়া যায়। বাংলাদেশের দরিদ্রতম মানুষ—বিশেষ করে কারখানার শ্রমিক এবং শহরের ভাসমান মেহনতি শ্রেণি—নেতিবাচক স্বাধীনতার (রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা) চেয়ে ইতিবাচক স্বাধীনতাকে (সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকার) বেশি প্রাধান্য দেওয়ার প্রবণতা দেখাত। যতক্ষণ পর্যন্ত সরকার নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রেখে অন্তত তাদের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছিল, তাদের সেই মানসিকতা শাসকগোষ্ঠীকে একধরনের ‘পারফরম্যান্স লেজিটিমেসি’ বা কর্মদক্ষতাজনিত বৈধতা প্রদান করেছিল।

তাহলে কীভাবে একটি শিক্ষার্থী আন্দোলন—যা ইতিবাচক স্বাধীনতার ভাষায় অর্থাৎ জীবিকার দাবির মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল—এত দ্রুত নেতিবাচক স্বাধীনতার দাবিতে রূপান্তরিত হলো এবং শেষ পর্যন্ত সরকারের এক দফা পদত্যাগের গণদাবিতে পরিণত হলো? এই ধাঁধার উত্তর খুঁজতে হলে রাজনৈতিক বৈষম্যের স্বরূপ বিশ্লেষণ জরুরি। আর এই রাজনৈতিক বৈষম্যই নির্ধারণ করে দেয় কীভাবে অভ্যুত্থানের তিন প্রধান নিয়ামক—শিক্ষার্থী, শহরের ভাসমান মেহনতি শ্রেণি এবং শিল্প শ্রমিক—একত্রে ‘জনতা’র সঙ্গে মিলে স্বাধীনতার এই দুটি রূপকে পরিপূরক হিসেবে দেখেছিল।

২০২৪ সালের জুলাইয়ের শেষ এবং আগস্টের শুরুর সেই উত্তাল দিনগুলোতে শ্রেণি ও সম্প্রদায়ের সীমা ছাড়িয়ে তৈরি হয়েছিল এক অনন্য সমতাকামী সংহতি। লেলিনের সেই বিখ্যাত উক্তিটি যেন এই মুহূর্তের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়: ‘এমন দশক আছে যখন কিছুই ঘটে না, আবার এমন সপ্তাহও আসে যখন দশকের ইতিহাস ঘনীভূত হয়ে উঠে আসে।’

রাজনৈতিক সম্পদের অসম বণ্টন থেকেই রাজনৈতিক বৈষম্য তৈরি হয়। এই সম্পদ সামাজিক, অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক হতে পারে। এর মধ্যে অর্থ, মতাদর্শ, দলীয় কাঠামো, বংশানুক্রমিক যোগাযোগ, সামাজিক অবস্থান, পৃষ্ঠপোষক-গ্রাহক সম্পর্ক—যেকোনো উপাদান থাকতে পারে; যেগুলো একজন ব্যক্তি তার পক্ষে সিদ্ধান্তকে রাষ্ট্রীয় নীতি বা নিজ স্বার্থে ব্যবহার করতে পারে। বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের স্বৈরাচার, বংশানুক্রমিক ও অধিপত্যবাদী শাসন, একক আধিপত্যশীল দলের রাজনীতি, ‘ক্যাচ-অল’ (সর্বজনগ্রাহী) দলগুলোর উপস্থিতি, দুর্বল নাগরিক সমাজ এবং কার্যকারিতাহীন বামপন্থার যৌথ প্রভাবে মূলত একটি ‘পার্টি-স্টেট’ বা দলীয় রাষ্ট্র এবং পৃষ্ঠপোষকতা ও ক্লায়েন্টিলিজম-কেন্দ্রিক রাজনীতির জন্ম দেয়। এসব বৈশিষ্ট্য উল্লিখিত তিন মূল অনুঘটকের পছন্দ ও ক্ষমতার উৎস—দুটোই পুনর্গঠন করে।

২০২৪ সালের জুলাই মাসে কোটা সংস্কারের দাবিতে রাজপথে নামা শিক্ষার্থীদের ওপর সরকারের চরম নৃশংস প্রতিক্রিয়া ছিল আন্দোলনের বারুদাগারে অগ্নিসংযোগের মতো। কিন্তু শিক্ষার্থীরা মাঠ ছাড়েনি। তাদের শক্তি নিহিত ছিল মূলত বিপুল সংখ্যাধিক্যে এবং গত কয়েক দশকে সরকারি ও বেসরকারি উচ্চশিক্ষার দ্রুত প্রসারের ফলে ক্যাম্পাসগুলোতে গড়ে ওঠা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা রাজনৈতিক পরিকাঠামোর মধ্যে। যে কারণে এই অভ্যুত্থান এত দ্রুত সারা দেশে ছড়িয়ে পড়তে পেরেছিল। আন্দোলন যত ছড়িয়েছে, ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন ‘বাংলাদেশ ছাত্রলীগ’ ততই ভেতর থেকে ফাঁপা ও দুর্বল হয়ে পড়েছে—যা সাধারণ শিক্ষার্থীদের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে। এখানে একটি পরিহাস লক্ষণীয়। দলীয় অনুগত গ্রাহকদের পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার উদ্দেশ্যে সরকার যেসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন বাড়িয়েছিল, দুর্ঘটনাবশত সেগুলোই এমন এক তরুণসমাজ তৈরি করেছিল, যারা সরকারের কবর খুঁড়তে সাহায্য করেছে—এমন এক রাজনৈতিক ফলাফল, যা কেউ আগে থেকে কল্পনা করেনি।

ঢাকায় ‘আরবান প্রিক্যারিয়েট’ বা ভাসমান মেহনতি মানুষ—যেমন হকার, ফেরিওয়ালা, রিকশাচালক, ক্যাব ও ডেলিভারি ড্রাইভার এবং গৃহকর্মীরা—যেভাবে জমাটবদ্ধ হয়ে আছে, তা আর কোথাও সমভাবে দেখা যায় না। রাজনৈতিক বৈষম্যের কাঠামোতে তারা দ্বিবিধ অবস্থানে রয়েছে: একদিকে তারা নিপীড়নের শিকার, অন্যদিকে তারা ‘অরাজনীতি’র অনুঘটক—যা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার স্থানীয় প্রতিনিধি ও পুলিশের সঙ্গে প্রাত্যহিক, প্রাতিষ্ঠানিকতাহীন সংঘর্ষ ও দর-কষাকষির মধ্য দিয়ে পরিচালিত হয়। সমাজবিজ্ঞানী আসিফ বায়াতের ভাষায়, এই মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে তারা নগর উৎপাদনের স্থানগুলোতে নিজস্ব ‘রাজনৈতিক ক্ষেত্র’ গড়ে তোলে।

বাংলাদেশে এসব ক্ষেত্র স্বৈরতন্ত্র, ‘পার্টিয়ার্কি’ (দলতন্ত্র—যেখানে রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়কেই দল একচ্ছত্রভাবে নিয়ন্ত্রণ করে) এবং প্রাত্যহিক চাঁদাবাজি ও তোলাবাজির কাঠামোর ভেতরে ভীষণভাবে আবদ্ধ। প্রাতিষ্ঠানিক সংগঠনের অভাব, টেকসই ট্রেড ইউনিয়নের অনুপস্থিতি এবং বামপন্থী দলগুলোর সহায়তার ঘাটতি এই শ্রেণিকে আরও দুর্বল করে রেখেছিল; বাস্তবত, দলীয় অনুগত পুলিশ এবং ক্যাডাররা এদের ওপর একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করত। কিন্তু অভ্যুত্থানের সময়, এই ভাসমান শ্রেণি তাদের সব ক্ষমতা দিয়ে মাঠে নামে। তাদের সাহসের পেছনে ছিল শোষক রাষ্ট্রের প্রতি তীব্র ক্ষোভ, রাজধানী ও তার চারপাশে তাদের বিপুল উপস্থিতি এবং মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়ানোর দুঃসাহসিক মানসিকতা। তারা আন্দোলনের সূচনা বা নেতৃত্ব দেয়নি ঠিকই, তবে জনতার অবয়ব গঠন এবং রাষ্ট্রীয় দমন–পীড়নের প্রধান আঘাত সয়ে তারা আন্দোলনের অপরিহার্য চালিকা শক্তিতে পরিণত হয়েছিল।

অন্যদিকে শিল্প শ্রমিকশ্রেণি দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্র ও শিল্পমালিকদের মধ্যকার এক শ্রমিকবিরোধী বন্দোবস্তের অধীনে বসবাস করে আসছে। ট্রেড ইউনিয়ন ও বাম রাজনীতির প্রান্তিকতার কারণে এই বন্দোবস্তের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। এর মাশুল সর্বত্র দৃশ্যমান—মালিকদের স্বার্থবান্ধব আইন ও মজুরি কাঠামো, শক্তি প্রয়োগ করে শ্রমিক আন্দোলন নস্যাৎ করা এবং স্বাধীন ট্রেড ইউনিয়নগুলোকে চেপে রেখে ক্ষমতাসীন দলের অনুগত ইউনিয়নগুলোকে লালন করা। তবে অভ্যুত্থান শুরু হওয়ার পর ঢাকার চারপাশের ঘন শিল্পাঞ্চল ও শ্রমিক এলাকাগুলো কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়। ভাসমান মেহনতি শ্রেণির মতোই, শ্রমিকদের ক্ষেত্রেও মূল শক্তি হয়ে ওঠে তাদের বিপুল সংখ্যা এবং ক্ষোভ থেকে জন্ম নেওয়া এক আপসহীন, বিপ্লবী প্রস্তুতি।

তবু একটি প্রশ্ন থেকেই যায়: এই তিনটি গোষ্ঠীই অতীতে বহুবার রাজপথে নেমেছে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা করেছে জীবিকার দাবিতে। খুব কম সময়েই তারা মৌলিক রাজনৈতিক সমতা—সুযোগের বা ফলাফলের—দাবি তুলেছে। সামাজিক-রাজনৈতিক বন্দোবস্তের গভীর রূপান্তর এবং এলিট শ্রেণির একচ্ছত্র ক্ষমতার অবসান দাবি করে তারা রাস্তায় নামেনি। কিন্তু এবার জীবিকার দাবি অবিশ্বাস্য দ্রুততায় শাসনব্যবস্থার পতনের দাবিতে রূপ নেয়। এই রূপান্তর কীভাবে সম্ভব হলো?

এর উত্তর শাসকগোষ্ঠী ও সমাজের মধ্যকার সম্পর্কের পরিবর্তিত গতিশীলতার মধ্যে। ১৯৯০-এর দশক থেকে ২০০০-এর দশকের শুরু পর্যন্ত, ব্যালট বাক্সের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের ক্ষমতার ওপর বাংলাদেশের মানুষের আস্থা তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল; একই সঙ্গে মৌলিক দাবি তোলা ও সংগঠিত হওয়ার সুযোগও ছিল বেশি। কিন্তু ২০১৪ সালের পর তা এক বদ্ধ স্বৈরতন্ত্রে রূপ নেয়, যা নজরদারি ও সহিংসতার ভয়ংকর ক্ষমতায় সজ্জিত হয়ে রাজনীতির নিয়মাবলি নতুন করে সাজায়। ফলে একক বা যৌথ—যেকোনো ধরনের প্রতিবাদ বা ভিন্নমত পোষণ করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যয়বহুল হয়ে দাঁড়ায়। তবে অভ্যুত্থানের শেষ দিনগুলোতে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক ধারণায় এক চরম পরিবর্তন আসে।

শাসনব্যবস্থার ভেতরের ফাটলগুলো যখন স্পষ্ট হতে শুরু করে, তখন রাজনৈতিক দাবি তোলা আর আগের মতো অসম্ভব বা বিপজ্জনক বলে মনে হয়নি। এই অভ্যুত্থান প্রতিবাদের ঝুঁকি ও মূল্য এক ধাক্কায় কমিয়ে দিয়েছিল—শুধু তিনটি মূল অনুঘটকের জন্যই নয়, বরং দমন–পীড়নের শিকার বিভিন্ন মতাদর্শ ও পরিচয়ের সর্বস্তরের মানুষের জন্যও। এক অভূতপূর্ব ও ক্ষণস্থায়ী মুহূর্তে ‘জনতা’ এক অখণ্ড সত্তা হিসেবে একত্র হয়, যারা কোনো আংশিক সংস্কার নয়—বরং আমূল পরিবর্তনের দাবি তোলে। সর্বোপরি, এই অভ্যুত্থান সাধারণ নাগরিকদের মনে বিশ্বাস জাগিয়ে তোলে যে তারাও জিততে পারে; আর এই বিশ্বাসই তাদের ঝুঁকি নিতে উৎসাহিত করে।

ফলে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের শেষ এবং আগস্টের শুরুর সেই উত্তাল দিনগুলোতে শ্রেণি ও সম্প্রদায়ের সীমা ছাড়িয়ে তৈরি হয় এক অনন্য সমতাকামী সংহতি। লেলিনের সেই বিখ্যাত উক্তিটি যেন এই মুহূর্তের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়: ‘এমন দশক আছে যখন কিছুই ঘটে না, আবার এমন সপ্তাহও আসে যখন দশকের ইতিহাস ঘনীভূত হয়ে উঠে আসে।’

  • ড. মির্জা হাসান ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের জ্যেষ্ঠ গবেষক

  • মতামত লেখকের নিজস্ব