ইরাসমাস মুন্ডুসের ড্রিম প্রোগ্রামের অধীনে ইউরোপের নানা দেশ ঘুরে উচ্চশিক্ষা নিচ্ছেন খন্দকার মাইনুল ইসলাম। তাঁর অভিজ্ঞতা শুনেছেন ফুয়াদ পাবলো।

‘ইদার ইউ আর আ জিনিয়াস, অর ইউ আর ক্রেজি (হয় তুমি জিনিয়াস, না হয় পাগল)।’

চিভনিং বৃত্তির একজন ব্রিটিশ সমন্বয়কারী কথাটি বলেন। তিনি শুনেছিলেন যে তাঁদের অফারটি তিনি গ্রহণ করছেন না। সুযোগটি নিয়ে বিস্ময় প্রকাশের মতো কারণও যে ছিল, তা কথায় উঠে আসে। কারণ, অনেকের কাছেই এমন সুযোগ জীবনে একবারই আসে। তবে দুটি বৃত্তির ক্ষেত্রেই তিনি নির্বাচিত ছিলেন—ইরাসমাস মুন্ডুস এবং চিভনিং। তাই একটি পথ বেছে নেওয়ার প্রশ্নই ছিল সামনে।

আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশের (এআইইউবি) তড়িৎ ও ইলেকট্রনিকস প্রকৌশল বিভাগে পড়ার সময়ই তিনি ইরাসমাস মুন্ডুস সম্পর্কে জানতে পারেন। সে সময় তাঁর মনোযোগ ছিল শুধু ভালো ফল বা একটি ডিগ্রি অর্জনে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর বিশ্বাস ছিল, বিশ্ববিদ্যালয় হলো নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার, নতুন অভিজ্ঞতা নেওয়া এবং ভবিষ্যতের ভিত শক্ত করার জায়গা। সেই বিশ্বাস থেকেই তিনি আইইইই এআইইউবি স্টুডেন্ট ব্রাঞ্চের স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ শুরু করেন। এরপর তিনি এআইইউবি রোবোটিকস ক্রুর সঙ্গে যুক্ত হন এবং দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রতিযোগিতা, সেমিনার, কর্মশালা ও সম্মেলনে নিয়মিত অংশ নিতে থাকেন। ধীরে ধীরে তাঁর উপলব্ধি তৈরি হয়—ক্লাসরুমের বাইরের অভিজ্ঞতাও সমান জরুরি। নেতৃত্ব, যোগাযোগদক্ষতা, দলগত কাজ এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজেকে উপস্থাপনের সক্ষমতাও সে প্রস্তুতির অংশ হয়ে ওঠে।

তৃতীয় বর্ষে আইইইই এআইইউবি স্টুডেন্ট ব্রাঞ্চের ভাইস চেয়ারপারসন নির্বাচিত হওয়ার পর তাঁর সুযোগ আরও বাড়ে। তখন তিনি এআইইউবিতে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের প্রথম ইউরোপীয় ইউনিয়ন ডেলিগেশনের ইরাসমাস+রোডশোতে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান। সেখানেই তিনি প্রথমবারের মতো ইরাসমাস মুন্ডুস সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে জানতে পারেন।

২০২৩-২৪ সালে আইইইই এআইইউবি স্টুডেন্ট ব্রাঞ্চের চেয়ারপারসন থাকাকালে তিনি টেকসই জ্বালানি বিষয়ে আরও গভীরভাবে কাজ শুরু করেন। ৫৬টি সেমিনার, ওয়েবিনার ও সম্মেলনের আয়োজন করেন তিনি ও তাঁর টিম। এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে নেতৃত্ব, সমন্বয়, নেটওয়ার্ক তৈরি এবং বিভিন্ন ধরনের চর্চা এগিয়ে যায়। একই সময়ে তাঁর সাতটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়, ফলে গবেষণার প্রতি আগ্রহও আরও বাড়তে থাকে। ২০২৪ সালে স্নাতক শেষ করেন তিনি। ভালো ফলের জন্য স্বর্ণপদকও পান।

পরবর্তীতে বাংলাদেশের একটি শীর্ষ বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করার সুযোগ পান। তবে কয়েক মাস কাজ করার পরই তিনি বুঝতে পারেন, গবেষণার প্রতি আগ্রহটা বেশি। সিদ্ধান্ত নেওয়াটা সহজ ছিল না—কারণ, ভালো একটা চাকরি ছেড়ে অনিশ্চয়তার পথে হাঁটা স্বাভাবিকভাবেই ঝুঁকিপূর্ণ। সে সময় সাহস জোগান তাঁর মা। তিনি বলেন, ‘তুমি আরও বড় কিছু করার জন্যই জন্মেছ। অন্তত চেষ্টা করো।’

চাকরি ছেড়ে এরপর তিনি আইইএলটিএস, বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন ও স্কলারশিপের প্রস্তুতি শুরু করেন। আশপাশের অনেকেই সিদ্ধান্তটিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখলেও তিনি মনে করেন—কিছু স্বপ্ন আছে, যেগুলোর জন্য নিরাপদ জায়গা ছেড়ে বেরিয়ে আসতেই হয়।

প্রথমে তিনি আবেদন করেন চিভনিং স্কলারশিপে। আবেদন প্রক্রিয়াটি তাঁকে নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছে—এখানে শুধু একাডেমিক সাফল্য নয়, নেতৃত্ব, সামাজিক প্রভাব, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও দৃষ্টিভঙ্গিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। আবেদনপত্রের তিনটি প্রবন্ধে তিনি লিখতে/ব্যাখ্যা করতে বাধ্য হন—কেন তিনি যুক্তরাজ্যে পড়তে চান, তাঁর নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা কীভাবে তাঁকে অন্যদের তুলনায় আলাদা করে, এবং ভবিষ্যতে তিনি কী ধরনের পরিবর্তন দেখতে চান।

একই সময়ে তাঁকে যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও আবেদন করতে হয়। তিনি আবেদন করেন ইউনিভার্সিটি অব নটিংহ্যাম, ইউনিভার্সিটি অব ইয়র্ক ও ইউনিভার্সিটি অব অক্সফোর্ডে। চিভনিং নিয়ে তখন তাঁর আশাবাদ খুব বেশি ছিল না। কারণ, তিনি যাঁদের গল্প শুনেছেন তাঁদের অনেকেই ছিলেন জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা, করপোরেট লিডার বা নীতিনির্ধারক; আর তাঁর অভিজ্ঞতা তাঁদের তুলনায় কম।

ফেব্রুয়ারিতে সাক্ষাৎকারের জন্য নির্বাচিত হওয়ার খবর পেয়ে তাঁর আত্মবিশ্বাস ফিরে আসে। ব্রিটিশ হাইকমিশনে প্রায় ৪৫ মিনিটের সাক্ষাৎকারে একাডেমিক প্রস্তুতি, নেতৃত্ব, পেশাগত অভিজ্ঞতা এবং বাংলাদেশে ফিরে অবদান রাখার পরিকল্পনা নিয়ে তিনি দীর্ঘ আলোচনা করেন। সাক্ষাৎকার শেষে তাঁর মনে হয়েছিল, হয়তো সত্যিই একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

এআই দিয়ে কীভাবে আয় করবেন।

এরপর তিনি চারটি ইরাসমাস মুন্ডুস প্রোগ্রামে আবেদন করেছিলেন। চারটিতেই তিনি নির্বাচিত হন। শেষ পর্যন্ত তিনি বেছে নেন ইউরোপিয়ান মাস্টার ইন ডায়নামিকস অব রিনিউয়েবলস-বেজড পাওয়ার সিস্টেমস (ড্রিম) প্রোগ্রাম। চিভনিং যেখানে নেতৃত্ব ও সামাজিক প্রভাবকে বেশি গুরুত্ব দেয়, সেখানে ইরাসমাস মুন্ডুসের এই নির্বাচনের প্রক্রিয়া ছিল সম্পূর্ণ একাডেমিক ও প্রযুক্তিনির্ভর। আবেদনপত্র এবং স্টেটমেন্ট অব পারপাসের পর তাঁকে একটি প্রকল্প উপস্থাপন করতে হয়। এরপর অংশ নিতে হয় দীর্ঘ টেকনিক্যাল সাক্ষাৎকারে। তাঁর মনে আছে, তাঁর সাক্ষাৎকার পড়েছিল রোজার ঈদের দিন।

বাড়িভর্তি অতিথি। সবাই উৎসবের আনন্দে মত্ত। আর তিনি একটি ছোট ঘরে কম্পিউটারের সামনে বসে সাক্ষাৎকারের অপেক্ষা করছিলেন। ভাবছিলেন হয়তো গবেষণা, নেতৃত্ব কিংবা সহশিক্ষা কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন করা হবে। কিন্তু পুরো সাক্ষাৎকারে যে ৯টি প্রশ্ন করা হয়েছিল, তার প্রতিটিই ছিল পুরোদস্তুর টেকনিক্যাল। সাক্ষাৎকার শেষে তাঁর মনে হয়েছিল, এটাও খারাপ হয়নি।

এরপর এল আরও একটা উৎসবের দিন, পয়লা বৈশাখ। বন্ধুদের সঙ্গে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন—এমন সময় এল সেই বহু প্রতীক্ষিত ই-মেইল। সেখানে লেখা ছিল—আপনাকে ইরাসমাস মুন্ডুস স্কলারশিপের জন্য নির্বাচিত করা হয়েছে। কিছু মুহূর্ত তিনি স্থির হয়ে বসে ছিলেন। এরপর দৌড়ে গিয়ে মাকে খবরটি দেন। তাঁর কথা শেষ হওয়ার আগেই মা কান্নায় ভেঙে পড়েন। সেই মুহূর্তটি তাঁর জীবনের সবচেয়ে আবেগঘন ও স্মরণীয় মুহূর্তগুলোর একটি হয়ে থাকবে।