চাঁপাইনবাবগঞ্জে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা। এর ফলে ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা হাসপাতালে প্রকট হচ্ছে শয্যা সংকট। প্রতিদিন নতুন নতুন রোগী শনাক্ত হওয়ায় হাসপাতালের ওপর চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে মাঠপর্যায়ে মশক নিধন কার্যক্রম ঢিমেতালে চলার কারণে সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে ডেঙ্গুর সংক্রমণ তীব্র আকার ধারণ করেছে। ২১ জুলাই হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ১৩ জন, যা ১ আগস্ট বেড়ে দাঁড়ায় ২৭ জনে। গত ২১ জুলাই থেকে ১ আগস্ট পর্যন্ত মাত্র ১২ দিনে কেবল হাসপাতালেই নতুন করে ৮৮ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন এবং বহির্বিভাগে আরও ৪৫ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন। গত ২৮ জুলাই একদিনেই সর্বোচ্চ ১৩ জন নতুন রোগী ভর্তি হন।
প্রতিষ্ঠানটি আরও জানিয়েছে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ১৫১ জন ডেঙ্গু রোগী এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। এছাড়া ডেঙ্গু উপসর্গ নিয়ে বহির্বিভাগে আসা ৮৯ জনের শরীরে এডিস মশাবাহিত এই রোগের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
পৌর এলাকায় সংক্রমণ বৃদ্ধি ও হাসপাতালের প্রস্তুতি প্রসঙ্গে ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. মাহবুব হোসেন বলেন, "সবচেয়ে বেশি রোগী চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহর এলাকার। বিশেষ করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকায় ডেঙ্গু রোগী বেশি পাওয়া যাচ্ছে। আমরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেখে রোগীদের সঠিক চিকিৎসাসেবা দিতে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছি।"
চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার বিষয়ে তিনি জানান, ডেঙ্গু আক্রান্তদের নিবিড় পরিচর্যার জন্য হাসপাতালে দুটি আলাদা জায়গায় মোট ২০ শয্যার ‘ডেঙ্গু কর্নার’ স্থাপন করা হয়েছে (পুরুষ ওয়ার্ডে ১০টি এবং মহিলা ওয়ার্ডে ১০টি বেড)।
শয্যা সংকট ও সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে ডা. মাহবুব হোসেন বলেন, "রোগীর অতিরিক্ত চাপের কারণে প্রায়ই এই ২০টি শয্যাই পূর্ণ থাকে; খালি পাওয়ার ঘটনা খুবই কম। তবে রোগীর সংখ্যা যদি আরও বাড়ে, তবে প্রয়োজন অনুযায়ী অবিলম্বে বেডের সংখ্যা বৃদ্ধি করার ব্যবস্থা রয়েছে।"
হাসপাতালে রোগীর চাপ বাড়লেও জেলার চারটি পৌরসভার মশক নিধনে কার্যকর পদক্ষেপ না থাকায় জনমনে অসন্তোষ ছড়িয়েছে। নালা-নর্দমা অপরিচ্ছন্ন থাকা এবং নিয়মিত ফগিং না করায় এডিস মশার প্রজনন বাড়ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার রেহাইচর গ্রামের বাসিন্দা মো. জসিম উদ্দিন (৪৫) বলেন, "হাসপাতালে গেলে দেখা যাচ্ছে ডেঙ্গু রোগীর ভিড়, আর আমাদের পাড়া-মহল্লায় মশার উপদ্রবে থাকা দায় হয়ে পড়েছে। পৌরসভা থেকে মশার ওষুধ ছিটানো তো দূরের কথা, ড্রেনগুলোও ঠিকমতো পরিষ্কার করা হয় না। এই অবহেলার কারণে আমাদের ঘরে ঘরে ডেঙ্গুর ভয় ঢুকে গেছে।"
শিবগঞ্জ পৌরসভার বাসিন্দা ও স্কুলশিক্ষিকা মোসা. পারভীন আক্তার (৩৮) বলেন, "ডেঙ্গু পরিস্থিতি দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে, অথচ পৌর কর্তৃপক্ষের মশক নিধন কার্যক্রম চলছে ঢিমেতালে। কাগজে-কলমে অভিযানের কথা শুনলেও বাস্তবে ড্রেন বা নর্দমায় ফগিং স্প্রে করতে কাউকেই দেখছি না। মশা নিয়ন্ত্রণে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেবে।"
মশক নিধন কার্যক্রম বিষয়ে জানতে চাইলে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মামুন-অর-রশীদ বলেন, "পৌরসভার পক্ষ থেকে প্রায় প্রতিদিনই মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। তবে আমাদের বাজেট কম থাকায় হয়তো নাগরিকদের চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত ছিটানো সম্ভব হচ্ছে না।"
বিষয়টি নিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক উজ্জ্বল কুমার ঘোষের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, কেবল হাসপাতাল কেন্দ্রিক চিকিৎসা দিয়ে ডেঙ্গুর বিস্তার ঠেকানো সম্ভব নয়। পৌর এলাকাগুলোতে এডিস মশার লার্ভা ধ্বংস, ড্রেনেজ ব্যবস্থা পরিষ্কার এবং সচেতনতামূলক অভিযান জোরদার না হলে পরিস্থিতি আরও অনিয়ন্ত্রিত হতে পারে। একই সঙ্গে জ্বরের উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা।
জেলার সার্বিক পরিস্থিতি ও স্বাস্থ্য বিভাগের ভূমিকা নিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. এ.কে.এম. শাহাব উদ্দীন বলেন, "জুলাই মাসের শেষ দিক থেকে ডেঙ্গু রোগের প্রকোপ ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ নিয়ে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ সজাগ রয়েছে এবং বিষয়গুলো নিয়ে সংশ্লিষ্টদের কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে বলা হচ্ছে।"
মশক নিধন ও প্রতিরোধে সমন্বয়ের ওপর জোর দিয়ে সিভিল সার্জন আরও বলেন, "ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আনতে স্থানীয় সরকার বিভাগের সহযোগিতা আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। আমরা তাদের সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় করছি। যেসব এলাকায় ডেঙ্গু আক্রান্তের হার বেশি, ওইসব এলাকায় যেন বেশি বেশি মশক নিধন কার্যক্রম চালানো হয়—সে ব্যাপারে তাদের অনুরোধ জানানো হয়েছে।"
উল্লেখ্য, গত বছরও জেলায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছিল। সে সময় প্রায় প্রতিদিনই ৫০ জনের ওপরে মানুষ আক্রান্ত হয়েছিল এবং অন্তত ১০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়।