সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার মধ্যনগর বাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে অবস্থিত শতবর্ষী সরকারি পুকুরটির বর্তমান করুণ দশা কেবল একটি জলাধারের অবহেলার গল্প নয়, বরং এটি প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ববোধের পতনের এক নীরব প্রমাণ। জনকল্যাণের উদ্দেশ্যে খনন করা এই ঐতিহাসিক পুকুরটি বর্তমানে ময়লা-আবর্জনার স্তূপে পরিণত হয়েছে এবং এর প্রায় ৪০ শতাংশ এলাকা অবৈধ দখলে চলে গেছে। এই পরিস্থিতি প্রশাসনের নীরব ব্যর্থতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে।
একটি সমাজের নৈতিক অবস্থান প্রতিফলিত হয় তার জনসম্পদের প্রতি আচরণের মাধ্যমে। দীর্ঘদিনের অবহেলা, দখলদারি এবং অনিয়ন্ত্রিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ফলে এই ঐতিহাসিক জলাধারটি এখন কার্যত অকার্যকর। পুকুরটির চারপাশে গড়ে ওঠা বসতবাড়ি ও স্থাপনা, নিয়মিত বর্জ্য নিক্ষেপ এবং প্রশাসনিক নজরদারির অভাব একে একটি ক্ষুদ্র কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ পরিবেশগত বিপর্যয়ে রূপান্তর করেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই পরিবেশগত বিপর্যয়ের সরাসরি প্রভাব পড়ছে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ওপর। বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন দুর্গন্ধ, দূষণ এবং রোগজীবাণুর ঝুঁকির মধ্যে অবস্থান করছে। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ যেখানে নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত হওয়ার কথা, সেখানে এমন ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটি এখন কেবল পরিবেশগত সমস্যা নয়, বরং জনস্বাস্থ্য ও শিশুকল্যাণের একটি গুরুতর প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই সংকটে প্রশাসনের ভূমিকা পর্যালোচনার দাবি রাখে। অতীতে দখল উচ্ছেদের চেষ্টা করা হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। নিয়মিত তদারকি ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে পুনরায় দখলদারি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ভূমি প্রশাসন বিষয়টি অবগত থাকা সত্ত্বেও কার্যকর কোনো প্রতিকার দৃশ্যমান হয়নি, যা সমস্যা সমাধানে প্রাতিষ্ঠানিক দৃঢ়তা ও ধারাবাহিকতার অভাবকে নির্দেশ করে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সুনির্দিষ্ট ও বহুমাত্রিক পদক্ষেপ প্রয়োজন। প্রথমত, পুকুরটির সম্পূর্ণ দখলমুক্তি নিশ্চিত করতে হবে এবং একে নিয়মিত নজরদারির আওতায় আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, জরুরি ভিত্তিতে পূর্ণাঙ্গ খনন ও সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। তৃতীয়ত, ভবিষ্যতে দখল ও বর্জ্য নিক্ষেপ রোধে সীমানা নির্ধারণ ও স্থায়ী ঘের নির্মাণ করা প্রয়োজন। চতুর্থত, স্থানীয় সরকার ও জনগণের অংশগ্রহণে একটি রক্ষণাবেক্ষণ কমিটি গঠন করা যেতে পারে। সর্বোপরি, বর্জ্য ফেলার প্রবণতা বন্ধ করতে ওই এলাকায় পৃথক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।
তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অন্যথায়, এই পুকুরটির সাথে সাথে হারিয়ে যাবে আমাদের দায়িত্ববোধের শেষ চিহ্নটুকুও।