জুলাই মাসে ৩৬ জনের মৃত্যু এবং ৯ হাজার ২০৬ জন রোগীর হাসপাতালে ভর্তির পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে যে, ডেঙ্গুর পরিস্থিতি বর্তমানে কতটা উদ্বেগজনক। সাম্প্রতিক বছরগুলোর অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যেই ডেঙ্গুর সংক্রমণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। চলতি জুলাই মাসে টানা ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে এডিস মশার প্রজননের অনুকূল পরিবেশ না থাকা সত্ত্বেও সংক্রমণের হার ও মৃত্যুর সংখ্যা আগের ছয় মাসের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি। আবহাওয়াবিদদের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, এল-নিনোর প্রভাবে এ বছর বর্ষাকালে থেমে থেমে বৃষ্টি এবং তুলনামূলক বেশি গরম থাকতে পারে। এই ধরনের আবহাওয়া এডিস মশার বংশবৃদ্ধির জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত হওয়ায় ডেঙ্গু প্রতিরোধে বাড়তি সতর্কতা ও প্রস্তুতি প্রয়োজন।

একসময় ডেঙ্গু কেবল বর্ষা মৌসুমের এবং ঢাকা শহরকেন্দ্রিক রোগ হিসেবে পরিচিত থাকলেও, বর্তমানে এটি সারা দেশের এবং সারা বছরের একটি জনস্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে বর্ষাকালে সংক্রমণের ব্যাপকতা স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে। এবারের পরিস্থিতি আরও জটিল করার কারণ হলো, মার্চ মাস থেকে দেশে হামের প্রাদুর্ভাব চলছে। ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী ১ কোটি ৮৯ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার পরও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আসেনি; প্রতিদিন গড়ে এক হাজারের বেশি রোগী হামের চিকিৎসায় সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। এমন অবস্থায় হামের পাশাপাশি ডেঙ্গুর সংক্রমণও নিয়ন্ত্রণহীন হলে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।

গত সাত মাসে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মোট ৫৪ জনের মৃত্যু হয়েছে, যাদের মধ্যে নারী ৩৩ ও পুরুষ ২১ জন। অন্যদিকে, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ১৫ হাজার ৩১০ রোগীর মধ্যে পুরুষ ৯ হাজার ৪১২ ও নারী ৫ হাজার ৮৯৩ জন। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর আক্রান্তদের মধ্যে ডেন-৩ সেরোটাইপের প্রাধান্য দেখা যাচ্ছে। জনস্বাস্থ্যবিদদের মতে, একই ব্যক্তি একাধিক সেরোটাইপে আক্রান্ত হলে শক সিনড্রোমসহ স্বাস্থ্যঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।

নাগরিকদের জন্য ডেঙ্গু চিকিৎসার ব্যয় এখন বড় উদ্বেগের কারণ। সরকারি হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাবে অনেক রোগীকে বেসরকারি হাসপাতালে যেতে হয়, যার ফলে অনেক পরিবার ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে। চিকিৎসা ব্যয়ে নিঃস্ব হওয়ার পরও প্রিয়জনকে হারানো অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।

আড়াই দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশে ডেঙ্গুর সংক্রমণ চললেও এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে এখন পর্যন্ত বিজ্ঞানসম্মত ও কার্যকর কোনো কৌশল প্রণয়ন করা সম্ভব হয়নি। মশা নিধনের আলোচনা এখনো কেবল নগরকেন্দ্রিক এবং ওষুধ ছিটানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। জলবায়ু পরিবর্তন, চরমভাবাপন্ন আবহাওয়া ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে ডেঙ্গু এখন সারা বছরের রোগ, কিন্তু মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম কেবল বর্ষা মৌসুমকেন্দ্রিক হওয়ায় প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। কীটতত্ত্ববিদদের পরামর্শ অনুযায়ী জনগণকে সম্পৃক্ত করে বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনার মাধ্যমে এডিস মশা নির্মূল করাই এখন একমাত্র পথ।

বর্তমানে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন এবং বরিশাল বিভাগে ডেঙ্গুর সংক্রমণ বেশি। তাই ঝুঁকিপ্রবণ অঞ্চলগুলো চিহ্নিত করে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে জোরালো অভিযান শুরু করা প্রয়োজন। পাশাপাশি আক্রান্তদের চিকিৎসাসেবা যেন সহজলভ্য ও সাধ্যের মধ্যে থাকে, সেদিকে সরকারের বিশেষ নজর দেওয়া জরুরি। সামগ্রিকভাবে আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসের ঝুঁকি বিবেচনা করে ডেঙ্গু মোকাবিলায় সর্বোচ্চ সতর্কতা ও প্রস্তুতি গ্রহণ করা প্রয়োজন।