বর্ষার শুরুতেই ময়মনসিংহে আবারও প্রকোপ বাড়িয়েছে ডেঙ্গু। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে যত রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, জুলাই মাসের প্রথম ২২ দিনেই সেই সংখ্যাকে ছাড়িয়ে গেছে।
শনিবার (১ আগস্ট) সকাল পর্যন্ত ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪৯৭ জন, যাদের মধ্যে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, জানুয়ারি থেকে ২২ জুলাই সকাল পর্যন্ত মোট ৩৪৬ জন ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে শুধু ১ জুলাই থেকে ২২ জুলাই পর্যন্ত ভর্তি হয়েছেন ২২০ জন। বিপরীতে জানুয়ারি থেকে জুন এই ছয় মাসে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ১২৬ জন। অর্থাৎ, এক মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই জুলাইয়ে রোগীর সংখ্যা আগের ছয় মাসের তুলনায় প্রায় ৭৪ শতাংশ বেড়েছে।
চলতি বছর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মোট ছয়জন মারা গেছেন। ফেব্রুয়ারিতে একজন, জুনে তিনজন এবং জুলাইয়ে দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকায় গত ২ জুলাই থেকে হাসপাতালে পৃথক ডেঙ্গু ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে।
কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, প্রতি বছর জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুর সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি থাকে। গত বছর জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে ভর্তি হয়েছিলেন ১৭৬ জন এবং মৃত্যু হয়েছিল একজনের। তবে আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঁচ মাসেই ভর্তি হন ২ হাজার ২২৭ জন এবং মারা যান ২৮ জন। চলতি বছর ২ জুলাই থেকে ২২ জুলাই দুপুর পর্যন্ত ডেঙ্গু ওয়ার্ডে ভর্তি হয়েছেন ২৪২ জন, যাদের মধ্যে শতাধিক ময়মনসিংহ জেলার বাসিন্দা। এই রোগীদের প্রায় ৫৬ শতাংশই সিটি করপোরেশন এলাকার, যাদের মধ্যে নওমহল, আকুয়া মাদ্রাসা কোয়ার্টার ও বাউন্ডারি রোড এলাকা থেকে সবচেয়ে বেশি রোগী এসেছেন।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বাইরে জেলার ১২টি উপজেলায় ২২ জুলাই পর্যন্ত আরও ৩৫ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। বর্তমানে তাঁদের মধ্যে পাঁচজন হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন।
শনিবার (১ আগস্ট) বিকেলে সরেজমিনে দেখা যায়, ডেঙ্গু ওয়ার্ডে বিভিন্ন বয়সের রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। শয্যার স্বল্পতার কারণে অনেকে মেঝেতেই চিকিৎসা নিচ্ছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১১ জন ভর্তি হয়েছেন এবং ১১ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। বর্তমানে ওয়ার্ডে মোট ৫৪ জন ভর্তি আছেন, যাদের মধ্যে পুরুষ ৩৫ জন, নারী ১৮ জন এবং শিশু একজন।
সংক্রমণের হার বিবেচনায় ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন নগরের ৬, ১০, ১১, ১২, ১৩ ও ১৪ নম্বর ওয়ার্ডকে ‘স্পেশাল জোন’ ঘোষণা করেছে। সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত আক্রান্ত ছিলেন চারজন, জুনে আটজন এবং ২১ জুলাই পর্যন্ত নতুন আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৮ জনে। সব মিলিয়ে চলতি বছরে আক্রান্ত হয়েছেন ৭০ জন, যার মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে।
আক্রান্ত রোগী ও স্বজনরা জানান, শুরুতে অনেকে সাধারণ জ্বর বা টাইফয়েড ভেবে চিকিৎসা নেওয়ায় সময়মতো ডেঙ্গু শনাক্ত হয়নি, ফলে শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়েছে। অনেকের প্লাটিলেট কমে যাওয়ায় রক্ত ও নিবিড় পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন পড়েছে।
ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার কাছিমপুর গ্রামের বাসিন্দা তাসলিমা আক্তার (২০) জানান, "প্রথমে স্থানীয় ফার্মেসি থেকে ওষুধ খাওয়া হয়। পরে চিকিৎসক টাইফয়েড সন্দেহে সাত দিন ইনজেকশন দিলেও জ্বর কমেনি। এরপর ময়মনসিংহ মেডিকেলে আসার পর ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। এখনো তেমন উন্নতি হয়নি।"
ঝুঁকিপূর্ণ চরপাড়া এলাকার বাসিন্দা আহম্মেদ হোসেন বলেন, "মশার উপদ্রব আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। নিয়মিত ওষুধ ছেটানো হলেও কাঙ্ক্ষিত ফল মিলছে না। সন্ধ্যার পর ঘরের বাইরে থাকা তো দূরের কথা, ঘরের ভেতরেও স্বস্তিতে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।"
বাঁশবাড়ি কলোনি এলাকার গৃহিণী মরিয়ম খাতুন বলেন, "মশার ভয়ে রাতে ঘুমানো যায় না। দিনে কিছুটা কম থাকলেও রাতে মশার উপদ্রব অনেক বেশি। সিটি করপোরেশন থেকে ওষুধ দেওয়া হলেও তাতে তেমন কোনো ফল পাওয়া যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে ওষুধেও ভেজাল রয়েছে।"
ময়মনসিংহের সিভিল সার্জন ডা. ফয়সল আহমেদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম ও জনসচেতনতা বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে।"
ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. রুকুনোজ্জামান রোকন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব এলাকায় প্রতিদিন দুই দফায় ফগিং ও স্প্রে কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি বাড়ি বাড়ি লিফলেট বিতরণ করে জনসচেতনতা বাড়ানো এবং বাসাবাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখার আহ্বান জানানো হচ্ছে।"
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. মোহাম্মদ মাইন উদ্দিন খান মুক্তকণ্ঠকে জানান, "বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়া স্বাভাবিক। রোগীর চাপ বিবেচনায় হাসপাতালে পৃথক আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত রাখতে হাসপাতাল প্রস্তুত রয়েছে।"
তার মতে, জ্বর ও শরীরে র্যাশ নিয়ে আসা রোগীদের দ্রুত পরীক্ষা করে ডেঙ্গু শনাক্ত করা গেলে জটিলতা অনেকটাই কমানো সম্ভব।