বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি মানুষের প্রধান খাদ্য ধান। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে চাল উৎপাদনের ওপর চরম ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে ধান উৎপাদন যতটা কমার কথা আগে ধারণা করা হয়েছিল, বাস্তবে সেই ক্ষতির পরিমাণ হতে পারে তার দ্বিগুণেরও বেশি। প্রচলিত বিজ্ঞানের মডেলগুলোতে চরম তাপমাত্রার প্রভাব সঠিকভাবে প্রতিফলিত হয়নি বলে গবেষকরা মনে করছেন।
বিজ্ঞানীদের নতুন সতর্কবার্তা অনুযায়ী, বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা মাত্র ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেলে বিশ্বে ধানের গড় উৎপাদন ৮ দশমিক ১ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে। সায়েন্স অ্যাডভান্সেস সাময়িকীতে প্রকাশিত এই গবেষণায় মাঠপর্যায়ের ২১৪টি পরীক্ষার তথ্যের সঙ্গে বিজ্ঞানীদের তৈরি ৭টি শস্য মডেলের তুলনা করা হয়েছে। সেখানে দেখা গেছে, পূর্বের মডেলগুলো মাত্র ৩ দশমিক ৮ শতাংশ ফলন কমার পূর্বাভাস দিয়েছিল, যা বাস্তব পরিস্থিতির তুলনায় প্রায় অর্ধেক।
গবেষণায় উঠে এসেছে যে, গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধির চেয়ে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি চরম তাপপ্রবাহ ধানের ক্ষতির প্রধান কারণ। পর্যবেক্ষণ করা ৭০ শতাংশেরও বেশি স্থানে ফলন কমার মূল কারণ হিসেবে এই চরম তাপপ্রবাহকে চিহ্নিত করা হয়েছে। জার্মানির হেলমহোল্টজ সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চের প্রধান লেখক ইয়িওয়েই জিয়ান গবেষণার কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন, "প্রাপ্ত তথ্য এবং মডেলের মধ্যকার এই পার্থক্যের মূল কারণ হলো বর্তমান ক্রপ মডেল ধানের প্রজনন ধাপে চরম তাপের ক্ষতি সঠিকভাবে হিসাব করতে পারে না।"
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ধানের শিষ ও দানা গড়ে ওঠার সময়েই ফসলটি চরম তাপপ্রবাহের প্রতি সবচেয়ে বেশি সংবেদনশীল থাকে। পটসডাম ইনস্টিটিউট ফর ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট রিসার্চের বিজ্ঞানী ক্রিস্টোফ মুলার চরম তাপমাত্রার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, "এটি মডেলগুলোর জন্য একটি তাৎপর্যপূর্ণ লাফ। এটি কেবল গড় তাপমাত্রা নয়, বরং প্রক্ষিপ্ত ক্ষতিতে চরম তাপপ্রবাহের ভূমিকা স্পষ্ট করে। গ্রীষ্মকালে খাপ খাইয়ে নিতে আমরা যেমন দৈনন্দিন সর্বোচ্চ তাপমাত্রা পরীক্ষা করি, গড় তাপমাত্রা নয়, ঠিক তেমনি ধানের ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য।"
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ফলন হ্রাসের প্রভাব সবচেয়ে বেশি হবে। বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের ক্ষেত্রে ফলন কমার আনুমানিক হিসাব ২ দশমিক ১ শতাংশ থেকে ৬ দশমিক ৬ শতাংশের মধ্যে থাকবে। এছাড়া থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন ও মিয়ানমারের ক্ষেত্রে ফলন কমার হার ৩ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে ৭ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। গবেষকদের মতে, ধানের প্রজনন ধাপ রক্ষা করতে আগাম অভিযোজন ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। তাপ-সহনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন, রোপণের সময় পরিবর্তন, সেচব্যবস্থার উন্নয়ন এবং মাটির গুণমান বৃদ্ধির মাধ্যমে এই বিপর্যয় মোকাবিলা করা সম্ভব।