দেশের নারী ও শিশু নির্যাতনের সামগ্রিক পরিসংখ্যান গত জুন মাসের তুলনায় জুলাইয়ে কিছুটা হ্রাস পেলেও ধর্ষণের ঘটনা এবং আত্মহত্যার হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার মাসিক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
এমএসএফ সভাপতি সুলতানা কামালের স্বাক্ষরে আজ শুক্রবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। দেশের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি জাতীয় দৈনিক এবং স্থানীয় মানবাধিকারকর্মীদের দেওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে এই প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।
সংস্থাটির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত জুন মাসে নারী ও শিশু নির্যাতনের মোট ৩২০টি ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছিল, যা জুলাই মাসে কমে দাঁড়িয়েছে ৩০৬টিতে। সামগ্রিক অপরাধের হার প্রায় ৪.৪ শতাংশ কমলেও এমএসএফ এই পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক হিসেবে বর্ণনা করেছে। তাদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, মোট অপরাধের সংখ্যা কমলেও নির্যাতনের ধরন এখন আরও বেশি নৃশংস ও জটিল রূপ নিয়েছে।
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, জুলাই মাসে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৯০টি, যেখানে জুন মাসে এই সংখ্যা ছিল ৬৮টি। অর্থাৎ এক মাসেই ধর্ষণের ঘটনা প্রায় ৩৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া যৌন নিপীড়ন বা হয়রানির ঘটনা জুনের ২১টি থেকে বেড়ে জুলাইয়ে হয়েছে ২২টি।
সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বৃদ্ধি দেখা গেছে আত্মহত্যার হারে। জুন মাসে ১৭টি আত্মহত্যার ঘটনার বিপরীতে জুলাই মাসে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮টিতে, যা প্রায় ৬৫ শতাংশ বৃদ্ধি। এমএসএফ মনে করে, ধর্ষণের মতো ঘটনা বৃদ্ধি নারী ও শিশুদের চরম নিরাপত্তাহীনতার ইঙ্গিত দেয় এবং আত্মহত্যার উচ্চ হার সামাজিক নিপীড়ন ও বিচারহীনতার মানসিক প্রতিক্রিয়া হতে পারে।
তবে কিছু সূচকে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। জুলাই মাসে দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ৭টি ঘটেছে, যা জুনে ছিল ১৬টি। ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা জুনের ৫টি থেকে কমে জুলাইয়ে হয়েছে ৩টি। ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা ৩৫টি থেকে কমে ৩৪টি এবং শারীরিক নির্যাতনের ঘটনা ৫৬টি থেকে কমে ৪২টিতে নেমেছে। এছাড়া জুনে ৭৬ জন নারী ও শিশু হত্যাকাণ্ডের শিকার হলেও জুলাইয়ে এই সংখ্যা কমে ৫২টিতে দাঁড়িয়েছে। তবে অপহরণ ও নিখোঁজের ঘটনা ১২টি থেকে সামান্য বেড়ে ১৩টি হয়েছে এবং অ্যাসিড নিক্ষেপের ঘটনা জুনের মতো জুলাইয়েও একটি ঘটেছে।
আইন অমান্য করে সালিসের মাধ্যমে গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ মীমাংসার প্রবণতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এমএসএফ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুলাই মাসে ধর্ষণের চেষ্টা ও বলাৎকারের মতো অন্তত তিনটি ঘটনা বেআইনি সালিসের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হয়েছে। এর মধ্যে দুটি ছিল ধর্ষণের চেষ্টা এবং একটি বলাৎকারের ঘটনা।
পাশাপাশি জুলাই মাসে পরিত্যক্ত অবস্থায় ১১ জন নবজাতককে উদ্ধারের তথ্য দেওয়া হয়েছে, যাদের মধ্যে ৮ জন মৃত এবং ৩ জন জীবিত। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সাধারণত এসব ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে পুলিশ কার্যকর কোনো তদন্ত করে না, ফলে অপরাধীরা আইনের আওতার বাইরে থেকে যায়। মৃত নবজাতকের ক্ষেত্রে পুলিশ সাধারণত অপমৃত্যুর মামলা করে এবং জীবিতদের সমাজসেবা অধিদপ্তরের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
এমএসএফের মতে, বেআইনি সালিস ও নবজাতক পরিত্যাগের ঘটনাগুলো সমাজে দায়মুক্তির সংস্কৃতিকে আরও দৃঢ় করছে।