দীর্ঘ দুই বছর কঠোর মুদ্রানীতি বজায় রাখার পর বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার কমিয়ে সাড়ে ৯ শতাংশে নামিয়েছে। নীতিগতভাবে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলেও প্রশ্ন উঠেছে, ঋণের সুদ সামান্য কমালেই কি বিনিয়োগ বাড়বে এবং তিন বছরের বেশি সময় ধরে চলা উচ্চ মূল্যস্ফীতির লাগাম টানা সম্ভব হবে? বাস্তব পরিস্থিতি বলছে, এর উত্তর সম্ভবত ‘না’।
বাংলাদেশে টানা তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। এই সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ধারাবাহিকভাবে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করলেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। এর থেকে স্পষ্ট হয় যে, মূল্যস্ফীতির মূল কারণ কেবল অতিরিক্ত চাহিদা ছিল না। বরং সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা, বিনিময় হারের অবমূল্যায়ন, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানিসংকট, পণ্য পরিবহন ও বিতরণে প্রতিবন্ধকতা এবং বাজারের অপ্রতিযোগিতামূলক কাঠামো এই পরিস্থিতিকে দীর্ঘস্থায়ী করেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে কার্যকর প্রতিযোগিতার অভাব, দুর্বল নজরদারি এবং কারসাজির সুযোগ মূল্যকে স্বাভাবিকভাবে সমন্বয় হতে দেয়নি। এমন পরিস্থিতিতে শুধু নীতি সুদহার বাড়িয়ে বা কমিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।
মুদ্রানীতির মাধ্যমে চাহিদা কমিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হলেও সেই নীতিকে কার্যকর ও সমন্বিত রাজস্বনীতি কিংবা সরবরাহ পক্ষের সংস্কার দিয়ে সহায়তা করা হয়নি। রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় ধারাবাহিকতার অভাব ছিল এবং সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা ও রাজস্ব আহরণ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় উন্নত হয়নি। পাশাপাশি কৃষিপণ্য বিপণন, সরবরাহ চেইন, প্রতিযোগিতা নীতি এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজনীয় সংস্কারের অনুপস্থিতির কারণে মূল্যস্ফীতির কাঠামোগত কারণগুলো অমীমাংসিত থেকে গেছে, যা অর্থনীতিতে স্থায়ী চরিত্র ধারণ করেছে।
বর্তমান বাস্তবতায় নীতি সুদহার কমানোর সিদ্ধান্তটি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসার একটি বার্তা দিতে পারে। তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতির মৌলিক কারণগুলোর খুব কমই পরিবর্তন হয়েছে। খাদ্য সরবরাহের দুর্বলতা, আমদানি ব্যয়ের চাপ, বিনিময় হারের অস্থিরতা এবং বাজারের বিকৃতি বহাল থাকলে কম সুদহার কেবল চাহিদা বাড়াবে, যা সরবরাহ না বাড়লে মূল্যস্ফীতির চাপকে আরও জোরালো করতে পারে।
বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য শক্তিশালী বেসরকারি বিনিয়োগ অপরিহার্য। তবে বিনিয়োগের পথে সুদের হারই একমাত্র বাধা নয়। উদ্যোক্তারা দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ ব্যবসায়িক ব্যয়, অনির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, নীতির অনিশ্চয়তা, চুক্তি বাস্তবায়নের দুর্বলতা এবং অনিশ্চিত ব্যবসায়িক পরিবেশকে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
এই প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা। নিরাপত্তাহীনতা, পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন এবং ভবিষ্যৎ নীতিগত স্থিতিশীলতা নিয়ে সংশয় থাকলে কোনো বিচক্ষণ বিনিয়োগকারী শুধু ঋণের সুদ সামান্য কমেছে বলে বড় বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন না। কারণ, বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত মূলত আস্থার ওপর নির্ভর করে, শুধু সুদের হারের ওপর নয়।
তাই নীতি সুদহার কমানোর কার্যকারিতা নিয়ে অতিরিক্ত আশাবাদী হওয়ার সুযোগ নেই। এতে তারল্য কিছুটা বাড়তে পারে এবং ঋণগ্রহীতারা সাময়িক স্বস্তি পেতে পারেন, কিন্তু এটি সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার বিকল্প হতে পারে না। মূল্যস্ফীতি টেকসইভাবে কমাতে সমন্বিত মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতি, কার্যকর বাজার তদারকি, বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা, সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়ন এবং বাজারে কারসাজি ও অপ্রতিযোগিতামূলক আচরণের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। একইভাবে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে ব্যবসার ব্যয় কমানো, সুশাসন নিশ্চিত করা, অবকাঠামো ও জ্বালানি পরিস্থিতির উন্নতি এবং রাজনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে এনে উদ্যোক্তাদের আস্থা পুনর্গঠন করতে হবে।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা প্রমাণ করেছে যে, মূল্যস্ফীতি ও বিনিয়োগ উভয়ই বহুমাত্রিক সমস্যা, তাই এর সমাধানও হতে হবে বহুমাত্রিক। শুধু মুদ্রানীতির একটি হাতিয়ার দিয়ে কাঠামোগত দুর্বলতা, বাজারের অদক্ষতা, সুশাসনের ঘাটতি এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মতো গভীর সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। সমন্বিত ও বিশ্বাসযোগ্য অর্থনৈতিক সংস্কার ছাড়া নীতি সুদহার কমানোর এই সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত বাস্তব পরিবর্তনের চেয়ে আশার সঞ্চারই বেশি করবে বলে মনে করেন সানেমের নির্বাহী পরিচালক ও অর্থনীতির অধ্যাপক সেলিম রায়হান।