দিল্লিতে শিক্ষার্থীদের এক সমাবেশে অংশ নেওয়ার পর সোয়াইন ফ্লু বা এইচ১এন১ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন প্রখ্যাত অভিনেত্রী শাবানা আজমি। জনবহুল স্থানে যাতায়াতের পর এই ধরনের সংক্রমণ বর্তমানে সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, তবে সঠিক সচেতনতার অভাবে এটি গুরুতর আকার ধারণ করতে পারে।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায়, সোয়াইন ফ্লু হলো এইচ১এন১ ইনফ্লুয়েঞ্জা ‘এ’ ভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট শ্বাসতন্ত্রের এক ধরনের তীব্র সংক্রমণ। এই ভাইরাসের মূল উৎপত্তি শূকরের শরীরে হলেও জিনগত পরিবর্তনের ফলে এটি মানবদেহে আক্রমণ ও বংশবৃদ্ধির ক্ষমতা অর্জন করেছে। মূলত আক্রান্ত ব্যক্তি কিংবা ভাইরাসে সংক্রমিত পরিবেশই এই রোগের প্রধান উৎস। এটি অত্যন্ত সংক্রামক একটি ভাইরাস।

আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি, কাশি বা কথা বলার সময় নির্গত ক্ষুদ্র জলকণার মাধ্যমে ভাইরাসটি বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়া দরজার হাতল, কাপড়, ফোন, গণপরিবহন বা যেকোনো পৃষ্ঠতলে এই ভাইরাস কিছু সময় বেঁচে থাকতে পারে। সংক্রমিত স্থানে হাত দেওয়ার পর সেই হাত দিয়ে চোখ, নাক বা মুখ স্পর্শ করলে ভাইরাসটি শরীরে প্রবেশ করে। বিশেষ করে সভা-সমাবেশ বা ভিড়ের মধ্যে এর সংক্রমণ সবচেয়ে দ্রুত ঘটে।

এই রোগের প্রধান লক্ষণগুলো সাধারণ ফ্লুর মতোই— যেমন জ্বর, তীব্র কাশি, গলাব্যথা, শরীরব্যথা, মাথাব্যথা ও চরম ক্লান্তি। প্রাথমিক অবস্থায় পর্যাপ্ত বিশ্রাম, তরল খাবার ও প্রচুর পানি পান করা জরুরি। তবে শিশু, প্রবীণ বা অন্তঃসত্ত্বা নারীদের মতো উচ্চঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ (যেমন: ওসেলটামিভির/টামিফ্লু) গ্রহণ করা যেতে পারে। তীব্র শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা বা শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হলে অবিলম্বে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া প্রয়োজন, অন্যথায় অবহেলায় মৃত্যু হতে পারে।

সময়মতো চিকিৎসা না নিলে সোয়াইন ফ্লু মারাত্মক রূপ নিতে পারে। এর ফলে ফুসফুসে নিউমোনিয়া ও তীব্র শ্বাসকষ্টের মতো জটিলতা তৈরি হয়। এছাড়া চিকিৎসা না হলে শরীরে সেপসিস, হৃদ্‌রোগ বা মস্তিষ্কে ইনফেকশনের মতো প্রাণঘাতী সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে ৬০ বছরের বেশি প্রবীণ, শিশু, গর্ভবতী নারী এবং অ্যাজমা, ডায়াবেটিক ও ক্যানসার রোগীদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।

এই ভাইরাস থেকে সুরক্ষিত থাকতে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা কিছু পদক্ষেপ অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছেন:

১. মাস্ক পরুন: জনবহুল স্থান বা যেকোনো সমাবেশে চলাচলের সময় সঠিকভাবে মাস্ক ব্যবহার করুন।
২. হ্যান্ড হাইজিন: সাবান-পানি বা অ্যালকোহলযুক্ত হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে ঘন ঘন কমপক্ষে ২০ সেকেন্ড হাত পরিষ্কার করুন।
৩. হাঁচি-কাশির শিষ্টাচার: হাঁচি বা কাশির সময় টিস্যু অথবা কনুইয়ের ভাঁজ ব্যবহার করুন।
৪. টিকা গ্রহণ: উচ্চঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের প্রতিবছর নিয়ম করে ইনফ্লুয়েঞ্জা/সোয়াইন ফ্লু-প্রতিরোধী ‘ফ্লু শট’ নেওয়া সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধক।
৫. আইসোলেশন: জ্বর বা কাশির লক্ষণ দেখা দিলে সাময়িকভাবে নিজেকে আলাদা রুমে রাখুন।

সোয়াইন ফ্লু নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই, তবে অবহেলা করা বিপজ্জনক। ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাই এই ভাইরাস থেকে সুরক্ষিত থাকার সহজ পথ।