দেশি উৎস থেকে গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে ব্যর্থ হয়ে আমদানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এক বড় সংকট তৈরি করেছে। ভেঙে পড়া অর্থনীতির চাকা সচল করতে, ব্যবসা-বিনিয়োগে গতি ফেরাতে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গ্যাসের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। তবে আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় ডলারের অভাব এবং এলএনজি মজুত সক্ষমতা না বাড়ায় পুরো অর্থনীতি এখন ধুঁকছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন শিল্পকারখানায় গ্যাস-সংযোগ দেওয়া তো দূরের কথা, বিদ্যমান শিল্প, বিদ্যুৎ খাত, যানবাহন, সেচ এবং গৃহস্থালিতেও চাহিদামাফিক গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। কক্সবাজারের মহেশখালীর দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের কোনোটি কারিগরি কারণে বন্ধ হয়ে গেলে গ্যাসসংকট এতটাই তীব্র হয় যে চারদিকে হাহাকার শুরু হয়ে যায়।
মুক্তকণ্ঠের খবর অনুযায়ী, সরকার নতুন শিল্পকারখানায় আপাতত গ্যাস-সংযোগ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও এটি সরকারের অর্থনীতি ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। জ্বালানিসংকট নিরসনের আগ পর্যন্ত নতুন সংযোগ বন্ধ রাখার এই সিদ্ধান্তে উদ্যোক্তা ও শিল্পমালিকদের মধ্যে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে যারা অনুমোদনের পর ডিমান্ড নোটের টাকা জমা দিয়েছেন এবং ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করেছেন, তারা সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। জানা গেছে, ছয়টি গ্যাস বিতরণ কোম্পানির কাছে ১ হাজার ৮৫৭টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের আবেদন অপেক্ষমাণ। গ্যাস-সংযোগের অভাবে অনেকে কারখানা চালু করতে পারছেন না, তবে ব্যাংকের কিস্তি পরিশোধ করতে হচ্ছে। উৎপাদন সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিলেও গ্যাসের লোড বৃদ্ধির নিশ্চয়তা না পাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান থমকে আছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, গ্যাস-সংযোগ না পেলে অনেক উদ্যোক্তাকে পথে বসতে হতে পারে।
২০১৭ সালের পর থেকে দেশি উৎসের গ্যাস উৎপাদন ক্রমাগত হ্রাস পেয়েছে এবং আমদানিনির্ভরতা বেড়েছে। বর্তমানে দৈনিক গড়ে ৩৮০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা থাকলেও সর্বোচ্চ সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে ২৭০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে আমদানি করা এলএনজির পরিমাণ ১০৫ কোটি ঘনফুট। অপেক্ষমাণ কারখানাগুলোতে সংযোগ দিতে হলে আরও ৩৫ কোটি ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন। সংকটের কারণে বর্তমানে এক খাত থেকে গ্যাস সরিয়ে অন্য খাতে সরবরাহের মতো জোড়াতালির ব্যবস্থা চলছে। ফলে সরবরাহ না বাড়িয়ে নতুন সংযোগ দেওয়া হলে সংকট আরও ঘনীভূত হবে।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে একাধিক বিকল্প নিয়ে কাজ করা হচ্ছে এবং সরবরাহ বাড়লে অগ্রাধিকার তালিকা অনুযায়ী নতুন উদ্যোক্তাদের সংযোগ দেওয়া হবে। তবে এই ‘আপাতত’ সময়সীমা কতদিন, তা নিশ্চিত না করায় অনিশ্চয়তা আরও বাড়ছে।
জ্বালানি খাতে স্থিতিশীলতা না এলে প্রণোদনসহ যেকোনো উদ্যোগ অর্থনীতির অনিশ্চয়তা কাটাতে পারবে না। দেশের বর্তমান জ্বালানি-সংকটের পেছনে আওয়ামী লীগ আমলের বড় দায় থাকলেও, এই দুষ্টচক্র থেকে বেরিয়ে আসার স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কোনো পরিকল্পনা এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান নয়। বরং সংকট দেখা দিলে পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার আমলাতান্ত্রিক নীতিই বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে। সরকারকে অবশ্যই দেশি উৎস ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে প্রাধান্য দিয়ে একটি বাস্তবসম্মত জ্বালানি রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে।
নতুন শিল্পে গ্যাস-সংযোগ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই দীর্ঘায়িত করা উচিত নয়। স্বল্প মেয়াদে প্রয়োজনে আমদানি বাড়িয়ে সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান শুরু করা এবং স্থলভাগে নতুন গ্যাস খোঁজার বিকল্প নেই। মজুত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে স্থল ও সমুদ্রে একাধিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ করা এখন সময়ের দাবি।