সাম্প্রদায়িকতা এবং ফ্যাসিবাদী প্রবণতাকে প্রতিহত করে একটি ঐক্যবদ্ধ সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্যের নেতারা। তাঁদের মতে, জুলাই অভ্যুত্থানটি কেবল একটি রাজনৈতিক আন্দোলন ছিল না, বরং এই জাগরণের পটভূমি তৈরিতে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে অভ্যুত্থানের মূল লক্ষ্য ছিল শোষণ ও বৈষম্যহীন একটি মানবিক সমাজ ও রাষ্ট্র গঠন করা, যা এখনো পূরণ হয়নি। তাই জনগণের সামগ্রিক মুক্তির লক্ষ্যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন অব্যাহত রাখার কথা বলেন তাঁরা।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) সন্ধ্যায় শিল্পকলা একাডেমির সেমিনার কক্ষে ‘চব্বিশ জুলাই: গণ–অভ্যুত্থানের রাজনৈতিক সংস্কৃতি’ শীর্ষক এক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। জুলাই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্য এই সেমিনারের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্যের আহ্বায়ক জামসেদ আনোয়ার এবং মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংগঠনের অন্যতম নেতা ও গণসাংস্কৃতিক কেন্দ্রের উপদেষ্টা জাকির হোসেন।
মূল প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়, চব্বিশের আন্দোলনের সময় ‘গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্য’ নামে কোনো সংগঠন ছিল না। সে সময় ৩১টি প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠন ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলন পরিচালনা করে। তারা ২৬ থেকে ৩০ জুলাই এবং ২ আগস্ট জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে, গানের মিছিল নিয়ে নূর হোসেন চত্বরে এবং শহীদ মিনার থেকে দ্রোহযাত্রার মাধ্যমে আন্দোলন এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। তবে সম্প্রতি কিছু রাজনৈতিক শক্তি সাংস্কৃতিক ঐক্যের সেই অবদানকে অবমূল্যায়ন করার এবং ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার চক্রান্ত করছে, যা প্রতিহত করার আহ্বান জানানো হয়।
বক্তারা মনে করেন, সাংস্কৃতিক সংগ্রাম মূলত একটি মতাদর্শিক লড়াই। জুলাই অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রক্ষমতার বিরুদ্ধে শক্তিশালী সামাজিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হলেও কোনো সংহত দর্শন নির্মিত হয়নি। বরং কিছু রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠী এই অভ্যুত্থানকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিপরীতে দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছে। কিছু উগ্রবাদী গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে এমনটি মনে করানো হয়েছে যে, কেবল তারাই এই অভ্যুত্থান ঘটিয়েছে। বক্তাদের মতে, অহেতুক মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে বিতর্ক, মাজার ও মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাঙা, মুক্তকণ্ঠ, ডেইলি স্টার, ছায়ানট ও উদীচীর কার্যালয়ে আগুন দেওয়া এবং মব সন্ত্রাসই ছিল তাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি।
সেমিনারে আরও আলোচনা করা হয় যে, অভ্যুত্থানের পর শ্রমিকদের ন্যায়সংগত দাবি এবং শোষণ-বৈষম্যহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা ম্লান হয়ে যায় এবং নির্বাচনই মুখ্য উদ্দেশ্য হয়ে ওঠে। এই পরিস্থিতি সৃষ্টিতে ও জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে বাম আন্দোলনের ভূমিকা থাকলেও তারা কেন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি, সেই ব্যর্থতার কারণ রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভেতরেই খুঁজতে হবে বলে বক্তারা মনে করেন।
সভাপতির বক্তব্যে জামসেদ আনোয়ার বলেন, “সাম্প্রদায়িক অপশক্তির উত্থান কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; শেখ হাসিনা সরকারের আমলেই সেই শক্তির বিকাশের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছিল।” তিনি আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে রাষ্ট্রের নিষ্ক্রিয়তার সুযোগ নিয়ে এই শক্তিগুলো আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। সাম্প্রদায়িকতা, ফ্যাসিবাদী প্রবণতা ও সব ধরনের অনাচারের বিরুদ্ধে নতুন প্রজন্মের ভাষা ও সৃজনশীল শক্তিকে ধারণ করে ঐক্যবদ্ধ সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি মোহন রায়হান বলেন, গণমানুষের শোষণমুক্তি ও উদার গণতান্ত্রিক সমাজ গড়তে রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন জরুরি। সাংস্কৃতিক কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে সুনির্দিষ্ট ও ধারাবাহিক কর্মসূচির মাধ্যমে সেই লক্ষ্য অর্জনে কাজ করে যেতে হবে।
বিবর্তন সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সম্পাদক মফিজুর রহমান বলেন, জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টির জন্য এখন নানা ধরনের বয়ান তৈরি করা হচ্ছে। কৌশলে মৌলবাদ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে। এটি প্রতিহত করতে ব্যাপক সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলা প্রয়োজন।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধের ওপর আলোচনা করেন চলচ্চিত্র নির্মাতা আকরাম খান, মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী পরিষদের সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশীদ, আবৃত্তিকার মাহমুদুল হাসান, চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সহসভাপতি কবি কামরুজ্জামান ভূঁইয়া, বাংলাদেশ থিয়েটারের প্রধান খন্দকার শাহ আলম এবং সমাজ অনুশীলন কেন্দ্রের সমন্বয়ক বিমল কান্তি দাস। নির্ধারিত বক্তাদের পর উন্মুক্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সুস্মিতা রায়।