প্রতিটি সফল প্রতিষ্ঠানে একজন চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার বা সিইও থাকেন। তিনি দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নির্ধারণ করেন, কৌশলগত দিকনির্দেশনা দেন, মানুষকে অসম্ভবকে সম্ভব করার প্রেরণা জোগান।

কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আড়ালে অনেক সময় আরেক ধরনের ‘সিইও’ও দেখা যায়—যাঁর কোনো নির্বাহী পদবি নেই, অথচ প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যতের ওপর প্রভাব সুগভীর। এই ভূমিকায় থাকা ব্যক্তিকে বলা যায় ‘চিফ এক্সকিউজ অফিসার’ বা ‘প্রধান অজুহাত কর্মকর্তা’।

চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার প্রশ্ন করেন, ‘আমরা কীভাবে এটা করতে পারি?’ চিফ এক্সকিউজ অফিসার প্রশ্ন করেন, ‘এটা কেন সম্ভব নয়?’ একটি প্রতিষ্ঠান এগোয় একজনের উদ্যোগে, কিন্তু আরেকজনের নিঃশব্দ প্রতিরোধে সেই গতি আস্তে আস্তে নিঃশেষও হয়ে যেতে পারে। বাস্তবে প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করে—এই দুই ‘সিইও’র মধ্যে কার প্রভাব সাংস্কৃতিকভাবে বেশি শক্তিশালী।

প্রকৃত নির্বাহী প্রধানের দায়িত্ব কেবল কার্যক্রম তদারকি বা প্রতিবেদন পর্যালোচনায় সীমিত নয়। তিনি পরিবর্তনের দিকনির্দেশনা দেন, সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টনের ব্যবস্থা করেন, দক্ষ দল গড়ে তোলেন এবং এমন পরিবেশ তৈরি করেন, যেখানে উদ্ভাবন বিকশিত হতে পারে। তবে সবচেয়ে দক্ষ প্রধান নির্বাহীও একা প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তন নিশ্চিত করতে পারেন না। দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবে রূপ নেয় কর্মীদের প্রতিদিনকার বহু সিদ্ধান্তে—একজন গ্রাহকসেবা প্রতিনিধি জটিল অভিযোগের সমাধান করছেন, একজন প্রযুক্তিবিদ ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের উদ্ভাবনী সমাধান নিয়ে আসছেন—এসবই সেই প্রক্রিয়ার অংশ।

এই জায়গাতেই বড় চ্যালেঞ্জ। চিফ এক্সকিউজ অফিসার কোনো পদবি নয়—এটি একধরনের মানসিকতা। এই মানসিকতা বোর্ডরুমে থাকতে পারে, মধ্যম ব্যবস্থাপনায়ও দেখা যেতে পারে, আবার প্রান্তিক পর্যায়েও কাজ করতে পারে। যখনই কেউ ধারাবাহিকভাবে মালিকানার বদলে সাফাই, সাহসের বদলে স্বাচ্ছন্দ্য বেছে নেন, তখনই বোঝা যায়—চিফ এক্সকিউজ অফিসার কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করেছে।

এই মানসিকতা সাধারণত সরাসরি প্রকাশ পায় না; যুক্তি বা অভিজ্ঞতার ভান তৈরি হয়। বলা হতে পারে—‘আমরা আগেও এটা চেষ্টা করেছি’, ‘আমাদের গ্রাহকেরা এটা মেনে নেবেন না’, ‘আমাদের হাতে যথেষ্ট সম্পদ নেই’, ‘এটা অন্য জায়গায় কাজ করতে পারে, এখানে নয়’, ‘আমরা সব সময় এভাবেই কাজ করে এসেছি।’ প্রথম শুনলে এসব কথা যুক্তিসংগত মনে হতে পারে, কারণ প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের সুবিবেচিত ঝুঁকি মূল্যায়ন দরকার। সমস্যা দেখা দেয় যখন নতুন কোনো উদ্যোগ চিন্তাশীল পর্যালোচনার বদলে অভ্যাসগত প্রতিরোধের সঙ্গে মুখোমুখি হয়।

অনেক সময় চিফ এক্সকিউজ অফিসাররা অত্যন্ত অভিজ্ঞ পেশাদার—তাদের কাছে প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞানও থাকে। কিন্তু সেই ইতিহাসই ফাঁদে পরিণত হয়, যখন তা মানুষকে ভবিষ্যৎ গ্রহণ করতে বাধা দেয়। তাঁরা জিজ্ঞাসা করেন না, ‘আমাদের কী হতে হবে’; বরং বারবার প্রশ্ন করেন, ‘আমাদের কেন বদলাতে হবে’।

অজুহাতনির্ভর সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় শিকার হয় উদ্ভাবন। ডিজিটাল ব্যাংকিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, দূরবর্তী কর্মপদ্ধতি, ক্লাউড কম্পিউটিং—সবকিছু মূলধারায় আসার আগে সংশয়ের মুখোমুখি হয়েছিল।

প্রতিষ্ঠান খুব কমই কেবল বহিরাগত প্রতিযোগিতার কারণে পরাজিত হয়। বরং প্রায়ই তারা ভেতর থেকে ধীর হয়ে পড়ে এমন এক সংস্কৃতির কারণে, যেখানে বাস্তবায়নের চেয়ে অজুহাত সহজ হয়ে ওঠে। প্রতিষ্ঠান অসাধারণ হয়ে ওঠে না শুধু ব্যতিক্রমী নেতৃত্বের কারণে—তারা অসাধারণ হয় তখনই, যখন সাধারণ মানুষেরা সিদ্ধান্ত নেন, অজুহাত আর তাঁদের সংস্কৃতির অংশ নয়।

প্রতিষ্ঠান যদি কেবল তাঁদের কথাই শুনত, যাঁরা ব্যাখ্যা করেন কেন পরিবর্তন সম্ভব নয়—তাহলে আজকের অনেক বড় উদ্ভাবনই বাস্তবে রূপ নিত না। এই সংস্কৃতি কেবল উদ্ভাবন বিলম্বিত করে না; উদ্ভাবকদেরও নিরুৎসাহিত করে। বারবার অহেতুক প্রতিরোধের মুখে অনেক কর্মী ধারণা প্রস্তাব করা বন্ধ করে দেন, কেউ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন, আবার কেউ প্রতিষ্ঠান ছেড়ে যান।

আর এই মানসিকতার সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো—এটি অনেক সময় আনুগত্যের ছদ্মবেশ নেয়। কেউ হয়তো আন্তরিকভাবেই বিশ্বাস করেন, তাঁরা প্রতিষ্ঠানের ঐতিহ্য রক্ষা করছেন। কিন্তু বাস্তবে তাঁরা হয়তো রক্ষা করছেন নিজেদের পরিচিত পরিবেশ ও স্বাচ্ছন্দ্যকে। পরিবর্তন মানেই শেখা, খাপ খাওয়ানো ও দায়বদ্ধতা—আর যাঁরা বদলাতে অনিচ্ছুক, তাঁদের কাছে প্রতিরোধ হয়ে ওঠে আত্মরক্ষার একধরনের উপায়।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই যুগে চ্যালেঞ্জটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। প্রতিষ্ঠানগুলো প্রযুক্তি, নেতৃত্ব উন্নয়ন ও ডিজিটাল সক্ষমতায় বিপুল বিনিয়োগ করছে। কিন্তু কোনো বিনিয়োগই এমন কাউকে বদলাতে পারে না, যিনি ইতিমধ্যে বদলাতে না চাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ কেবল প্রতিস্থাপনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং পুরস্কৃত করবে অভিযোজনক্ষমতাকে। ভবিষ্যতে মূল্যবান থাকবেন, তাঁরা সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের অভিজ্ঞতাধারী নাও হতে পারেন; বরং যাঁরা ক্রমাগত শেখেন এবং বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে কৌতূহলী থাকেন।

তাই নেতাদের উচিত সুস্থ মতভেদকে উৎসাহিত করা—কিন্তু সেই সঙ্গে গঠনমূলক প্রশ্ন ও অভ্যাসগত বাধাদানের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য তৈরি করা। কর্মদক্ষতা মূল্যায়নও শুধু আউটপুট দিয়ে নয়; অভিযোজনক্ষমতা, শেখার দক্ষতা ও মালিকানাবোধ—এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে হওয়া উচিত।

এই দুই মানসিকতার মধ্যে পাঁচটি মূল পার্থক্য এখানে তুলে ধরা যায়। চ্যালেঞ্জকে দূরদর্শী মানসিকতা দেখে সুযোগ হিসেবে, আর অজুহাতনির্ভর মানসিকতা দেখে বাধা হিসেবে। একজন পরিবর্তনকে আলিঙ্গন করেন, অন্যজন পরিচিত রুটিন আঁকড়ে থাকেন। একজন ফলাফলের দায়িত্ব নেন, অন্যজন পরিস্থিতি বা সম্পদের ওপর দায় চাপান। একজন সিদ্ধান্ত নেন দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যের ভিত্তিতে, অন্যজন ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্যের ভিত্তিতে। একজন আস্থা ও উদ্ভাবনের সংস্কৃতি গড়ে তোলেন, অন্যজন তৈরি করেন দ্বিধা ও আত্মতুষ্টির সংস্কৃতি।

করপোরেট সিএসআর: মানবিক দায়বদ্ধতা নাকি ব্র্যান্ডিংয়ের ছদ্মবেশ।

এক বাক্যে বলতে গেলে—চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার বলেন, ‘চলো একটা পথ খুঁজি।’ আর চিফ এক্সকিউজ অফিসার বলেন, ‘চলো একটা কারণ খুঁজি, কেন এটা হবে না।’ শেষ পর্যন্ত, প্রতিটি কর্মীকে প্রতিদিন একটি পছন্দের মুখোমুখি হতে হয়: ‘আমরা কীভাবে এটা সম্ভব করব’—নাকি ‘এটা কেন সম্ভব নয়’।

এই পছন্দই গড়ে দেয় ক্যারিয়ার, দল ও প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ। ‘সিইও’ পদবি কখনোই কেবল কর্ণার অফিসে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়; প্রতিটি কর্মীরই লক্ষ্য হওয়া উচিত ‘চিফ এক্সিকিউশন অফিসার’ হয়ে ওঠা।

প্রতিষ্ঠান খুব কমই কেবল বহিরাগত প্রতিযোগিতার কারণে পরাজিত হয়। বরং প্রায়ই তারা ভেতর থেকে ধীর হয়ে পড়ে এমন এক সংস্কৃতির কারণে, যেখানে বাস্তবায়নের চেয়ে অজুহাত সহজ হয়ে ওঠে। প্রতিষ্ঠান অসাধারণ হয়ে ওঠে না শুধু ব্যতিক্রমী নেতৃত্বের কারণে—তারা অসাধারণ হয় তখনই, যখন সাধারণ মানুষেরা সিদ্ধান্ত নেন, অজুহাত আর তাঁদের সংস্কৃতির অংশ নয়।

  • এম এম মাহবুব হাসান ব্যাংকার, উন্নয়ন গবেষক ও লেখক

    মতামত লেখকের নিজস্ব