সাভারের আশুলিয়া ও জিরোবোর পিচঢালা সড়ক, রাস্তার পাশের দেয়াল কিংবা বিদ্যুতের খুঁটি—রাজনৈতিক স্লোগান ও পণ্যের বিজ্ঞাপনের ভিড়ে এখন সবার নজর কাড়ছে এক অনন্য বার্তা। সাদা-কালো পোস্টারে লেখা এক আকুল আবেদন, যা যেন হারিয়ে যাওয়া কোনো গল্পের শেষ পাতা খোঁজার চেষ্টা।

আশুলিয়ার জিরোবো এলাকায় মো. মাসুদ রানা নামের এক যুবক তার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহপাঠী ‘স্বপ্না’কে খুঁজে পেতে এই অভিনব পদক্ষেপ নিয়েছেন। প্রায় দুই দশক আগে নিখোঁজ হওয়া সেই বন্ধুকে খুঁজে পাওয়ার শেষ চেষ্টা হিসেবেই তিনি পাড়া-মহল্লায় এই বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছেন।

জানা গেছে, ঘটনার সূত্রপাত ২০০৭ সালে। তখন জিরোবো ব্র্যাক স্কুলের তৃতীয় শ্রেণিতে পড়তেন মাসুদ ও স্বপ্না। ঈদের ছুটির পর হঠাৎ করেই স্বপ্নার স্কুলে আসা বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে মাসুদ জানতে পারেন, চরম পারিবারিক অভাব-অনটনের কারণে পড়াশোনা ছেড়ে পোশাক কারখানায় কাজে যোগ দিতে হয়েছিল স্বপ্নাকে। এরপর জিরোবোর বিভিন্ন তৈরি পোশাক কারখানা, যেমন—প্রিন্ট ফ্যাক্টরি, কন্টিনেন্টাল কিংবা ইনসেপ্টাসংলগ্ন এলাকার কারখানাগুলোর ফটকে ফটকে ঘুরেও স্বপ্নার কোনো খোঁজ পাননি তিনি।

বর্তমানে একটি পোশাক কারখানায় টেকনিক্যাল ম্যানেজার (মার্কেটিং) হিসেবে কর্মরত মাসুদ রানা কর্মসংস্থানের প্রয়োজনে জিরোবো ছেড়ে গাজীপুরের শ্রীপুরের মাওনা এলাকায় চলে যাচ্ছেন। দীর্ঘ সময় যে এলাকায় দাঁড়িয়ে স্বপ্নার অপেক্ষা করা যেত, সেই জায়গা ছেড়ে যাওয়ার প্রাক্কালে আবেগের বশেই তিনি এই পোস্টার সাঁটানোর সিদ্ধান্ত নেন।

মুঠোফোনে সংবাদদাতাকে মাসুদ রানা বলেন, “ছোটবেলায় জিরোবোতে একসঙ্গে পড়েছি। মনে এক ধরনের পছন্দ বা ভালোলাগা ছিল, কিন্তু শিশু বয়সে তা কোনোদিন বলা হয়নি। এমনকি তার কোনো ছবি বা ফোন নম্বরও আমার কাছে নেই। আমি এখন মাওনা চলে যাচ্ছি, এখন আর চাইলেও প্রতিদিন এসে খোঁজ করা সম্ভব নয়। তাই ভাবলাম যদি এই পোস্টারটি কোনোভাবে তার চোখে পড়ে! মৃত্যুর আগে শুধু একবার হলেও তার সঙ্গে কথা বলতে চাই।”

পোস্টারে লেখা ছিল, “স্বপ্না, তুমি যদি কোথাও থেকে এই পোস্টারটি দেখো, একবার শুধু যোগাযোগ করো। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তোমার সঙ্গে একবার দেখা হওয়ার অপেক্ষায় থাকব।”

বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনের বাইরে এমন আবেগঘন পোস্টার দেখে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে কৌতূহল তৈরি হয়েছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে চর্চা শুরু হয়েছে। স্পেকট্রাম গার্মেন্টসের সামনে সাঁটানো পোস্টারটি দেখে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আমিনুর রহমান বলেন, “গানে বা সিনেমায় ভালোবাসার মানুষের জন্য শহরজুড়ে পোস্টার সাঁটানোর কথা শুনেছি। বাস্তবে এমন নিঃশব্দ হাহাকার কখনো দেখিনি। সত্যি চাই, এই দুই বন্ধুর যেন দেখা হয়।”