চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা জুলাই মাসে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় (গতকাল বুধবার সকাল ৮টা থেকে আজ বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) দেশে এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু রোগে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে টানা ছয় দিন ধরে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে।
জনস্বাস্থ্যবিদ ও কীটতত্ত্ববিদদের আশঙ্কা, আগামী আগস্ট থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে থাকবে। তারা মনে করছেন, চলতি বছর ডেঙ্গু প্রতিরোধে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি, যা জুলাই মাসে এত মৃত্যু ও সংক্রমণের পেছনে একটি বড় কারণ। সাধারণত ডেঙ্গুর প্রকোপ সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত বেশি থাকে, কিন্তু চলতি মাসের বৃষ্টি এবং সরকারি উদাসীনতার কারণে এবার সংক্রমণের সময় অক্টোবর পর্যন্ত গড়াতে পারে।
সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা বিভাগে দুজন এবং খুলনা বিভাগে একজনের মৃত্যু হয়েছে ডেঙ্গুতে। এ সময় হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা ৪৬৩।
এ পর্যন্ত চলতি বছর ডেঙ্গুতে ৫৩ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আক্রান্তের সংখ্যা ১৫ হাজার ১৫৩।
জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা যান ১৮ জন। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ২ জন, ফেব্রুয়ারিতে ২ জন, মে মাসে ১ জন এবং জুন মাসে ১৩ জন মারা যান। চলতি মাসের ৩০ দিনে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ৩৫ জন।
গত ছয় মাসে দেশে ডেঙ্গুতে যত সংক্রমণ হয়েছে, চলতি মাসে তা প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে। জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন ৬ হাজার ১০৪ জন, আর চলতি মাসেই এ সংখ্যা ৯ হাজার ৫৩।
বিশিষ্ট জনস্বাস্থ্যবিদ বে–নজির আহমেদ বলেন, ‘আমরা ডেঙ্গুর মূল মৌসুমের মধ্যে ঢুকে পড়েছি। জুলাই মাসে ডেঙ্গুতে এত মৃত্যু এবং এত সংক্রমণ প্রমাণ করে এ রোগের বিস্তার রোধ করতে উদ্যোগের ঘাটতি ছিল। আসলে কোনো বড় উদ্যোগ চোখেও পড়েনি। এখনই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যথাযথ উদ্যোগ না নিলে পরিস্থিতি নাজুক হয়ে উঠবে সামনের দিনগুলোতে।’
চলতি মাসের ৫ তারিখ থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক বৃষ্টি হয়েছে। এরপর বৃষ্টি কমে আসে এবং তাপমাত্রা বেড়ে যায়। আবার চলতি সপ্তাহে বৃষ্টি বেড়ে যায়।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবীরুল বাশার বলেন, আগামী আগস্ট, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়তে থাকবে। সাধারণত এর প্রকোপ সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত থাকে, কিন্তু এবার অক্টোবর মাস পর্যন্ত তা চলে যেতে পারে।
তিনি বলেন, সাধারণত বড় বৃষ্টির অন্তত দুই মাস পর মশার বংশ বৃদ্ধি হতে থাকে। এখন পর্যন্ত সংক্রমণের যে উচ্চহার তা চলতে থাকতে পারে। আর দুই মাস পর অর্থাৎ অক্টোবর মাসে তা অব্যাহত থাকতে পারে। এটাই বড় শঙ্কার দিক।
ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি সেরোটাইপ ডেন-১, ডেন-২, ডেন-৩ ও ডেন-৪। কোনো ব্যক্তি একবার একটি সেরোটাইপে আক্রান্ত হলে অন্য সেরোটাইপে আবার আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। চলতি বছর আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ডেন-৩ সেরোটাইপের প্রাধান্য দেখা গেছে।
আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) বিজ্ঞানী মোহাম্মদ শফিউল আলম বলেন, ২০২৩ সাল থেকে গত বছর পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুর সেরোটাইপ–২–এর প্রাধান্য ছিল। এবার তাই ৩–এর প্রাধান্য থাকতে পারে।
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন বাদ দিয়ে চলতি বছর সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বরিশাল বিভাগে। গত বছর এ বিভাগের জেলা বরগুনায় ডেঙ্গুর সবচেয়ে বেশি রোগী ছিল।
ঢাকার বাইরে ব্যাপকহারে রোগের বিস্তার মৃত্যুর ঝুঁকি অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে বলে মনে করেন অধ্যাপক বে–নজির আহমেদ। তিনি বলেন, নতুন একটি সেরোটাইপের বিস্তার হওয়ায় এবার ঝুঁকি অনেক বেশি। এ ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে প্রধান কাজ হলো মশার বংশবিস্তার রোধ। কিন্তু এখন পর্যন্ত এ কাজের ক্ষেত্রে ইতিবাচক কিছু দেখছি না। সেটা রাজধানী বা এর বাইরে—সবখানেই এক অবস্থা।