বান্দরবানের রুমা উপজেলার লেংটংপাড়ায় তৈসাং ও নাংয়ো খুমি দম্পতির দুই ছেলে চার বছর বয়সী প্রেলং খুমি ও সাত বছর বয়সী খ্রেতং খুমিকে পাশাপাশি দুটি কবরে সমাহিত করা হয়।
তৈসাং ও নাংয়ো দম্পতির চার সন্তানের মধ্যে দুই সন্তান পরপর মারা যায়—হামের উপসর্গ নিয়ে। খ্রেতংয়ের মৃত্যু হয় ২৫ জুলাই এবং প্রেলংয়ের মৃত্যু হয় ২৭ জুলাই। রোববার খ্রেতংকে যেখানে সমাহিত করা হয়েছিল, মঙ্গলবার তার পাশেই প্রেলংকে কবর দেওয়া হয়। দুই ছেলের মৃত্যু এবং শেষকৃত্যের শোক-ধকল সামলে উঠতে পারেননি এই দম্পতি।
আক্রান্ত আরও দুই সন্তানকে নিয়ে তাঁরা গতকাল বুধবার রাতে জেলা সদর হাসপাতালে আসেন। সেখানে এখন ভর্তি আছে ১১ বছরের ছেলে পথাং এউং ও সাত মাস বয়সী মেয়ে লিংথং এ খুমি।
দুই দিনের ব্যবধানে দুই সন্তানের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ও আরও দুই শিশুর চিকিৎসার জন্য ছুটে বেড়াতে গিয়ে শারীরিকভাবে ভেঙে পড়েছেন তাঁরা। আজ বৃহস্পতিবার সকালে বান্দরবান সদর হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি দুই শিশুর শয্যার পাশে বিমর্ষ ও বিপর্যস্ত অবস্থায় বসে রয়েছেন তৈসাং ও নাংয়ো খমি।
আক্রান্ত দুই শিশুর মা নাংয়ো ছোট মেয়ে লিংথংকে আগলে রেখেছিলেন। বাবা তৈসাং ছিলেন ছেলের পাশে। কেমন আছেন জানতে চাইলে খুমি ভাষায় নাংয়ো বলেন, ‘কেমন আছি আমি জানি না, মরে আছি নাকি বেঁচে আছি, কিছুই জানি না।’ এটুকু বলতেই তাঁর দুই চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে।
তাঁদের ভাষ্যমতে, দুই সন্তানের মৃত্যুতে শেষকৃত্যের পরও দুশ্চিন্তা কমেনি। তৈসাং খুমি বলেন, ‘দুই সন্তান মারা গেছে। তাদের কবরে রেখে আরও দুই সন্তানকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছি। বাড়িতে কেউ নেই, হাসপাতাল এখন আমাদের বাড়ি।’
তৈসাং ও নাংয়ো খুমি দম্পতির বাড়ি রুমা উপজেলার যোগাযোগ–বিচ্ছিন্ন লেংটংপাড়ায়। রুমা-বগালেক-কেওক্রাডং সড়ক থেকে চড়াই–উতরাই পাহাড়ি পথে তিন ঘণ্টা হেঁটে যেতে হয় তাঁদের পাড়ায়। গত শনিবার ওই এলাকা থেকে অসুস্থ চার ছেলেমেয়েকে নিয়ে হাসপাতালে আসার পথে ছেলে খ্রেতং খুমির মৃত্যু হয়। তখন হাসপাতালে না এসে ফিরে যাওয়ার বাধ্যবাধকতায় পড়েন তাঁরা। পাড়ায় মৃত ছেলের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করেন। পরের দিন অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া শেষ করে তিন সন্তান নিয়ে হাসপাতালে আসেন। এরপর বান্দরবান সদর হাসপাতাল থেকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর সোমবার আরেক ছেলের মৃত্যু হয়।
বান্দরবান সদর হাসপাতালে হামের রোগীদের আইসোলেশন ওয়ার্ডে ২৯ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন। তাঁদের অধিকাংশই শিশু এবং সবাই প্রায় দুর্গম এলাকার বাসিন্দা। চিম্বুক পাহাড়ের রুইয়াংপাড়ার পাঁচজন রোগী রয়েছে। ওই পাড়ার রিংইয়ং ম্রো জানান, তাঁর দুই ছেলের মধ্যে আড়াই বছরের তাইলেং ম্রোর অবস্থার এখনো উন্নতি হয়নি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পাড়ায় আরও পাঁচ-ছয়জন হামের উপসর্গে আক্রান্ত।
রুমার আর্থাপাড়া থেকে এক রোগীর সঙ্গে আসা ইউপি সদস্য মৈথাং বম জানান, তাঁদের এলাকায় দুই বছর ধরে সরকারি ও বেসরকারি কোনো স্বাস্থ্যকর্মীর দেখা মেলেনি। বাসাত্লাংপাড়ায় একটি কমিউনিটি ক্লিনিক আছে, সেটিও দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে বলে তিনি জানান। হামের টিকা না পাওয়ায় লোকজন বেশি আক্রান্ত হচ্ছে বলেও তাঁর অভিযোগ।
জনপ্রতিনিধি ও সামাজিক নেতাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত মাস ও চলতি মাসে হামের উপসর্গে বেশ কয়েকটি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে শুধু লেংটং খুমিপাড়ায় সাত শিশু মারা গেছে। গালেঙ্গ্যার অংলাইপাড়ায় এক ম্রো শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
রুমা ও থানচির উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তারা জানান, রুমায় সাতজন এবং থানচিতে আটজন হামের উপসর্গের রোগী চিকিৎসাধীন। তাঁদের মতে, আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ধীরে ধীরে কমে আসছে।
বান্দরবান সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) তৌহিদুল আনোয়ার জানান, হামের রোগী কমে আসছে। তৈসাং ও নাংয়ো খুমি দম্পতির দুই সন্তানের অবস্থা এখন ভালো। তিনি বলেন, হাম মোকাবিলায় আয়োজিত জরুরি বৈঠকে সার্বক্ষণিক অ্যাম্বুলেন্স–সেবা সচল রাখা এবং জেলা পরিষদ, জেলা প্রশাসন, সেনাবাহিনী ও পুলিশ সম্মিলিতভাবে কাজ করবে বলে সিদ্ধান্ত হয়েছে।
চিকিৎসাধীন রোগীরা আক্রান্ত হওয়ার আগে হামের টিকা না পাওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে আরএমও তৌহিদুল বলেন, ‘অভিযোগ মিথ্যা, এটা বলা যাবে না। পাড়াবাসী টিকা নিতে চান না, এ রকম অজুহাতও রয়েছে। যারা টিকা নিতে চান না, সমস্যা তাদের নয়; যাঁরা টিকা দিতে যান, দুর্বলতা তাঁদেরই।’