আমাদের স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে দেশের মুখ উজ্জ্বল করছে, যদিও প্রতিকূলতা তাদের পথচলাকে কঠিন করে তুলছে। বিশেষ করে অলিম্পিয়াডগুলোতে বাংলাদেশের অবস্থান এখন আর অজানা নয়। এক দশক আগে যাঁরা ‘বেংলাদেশ’ বলতেন, তাঁদেরও এখন ‘বাংলাদেশ’ বলতে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। আমাদের শিক্ষার্থীরা বিশ্বমঞ্চে নিজেদের পরিচয় তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে।

তবে, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের পেছনের গল্পটি অনেকটা অজানা। পত্রিকার পাতায় শুধুমাত্র মেডেল প্রাপ্তির খবর আসে, কিন্তু ভিসা পাওয়ার জন্য আমাদের শিক্ষার্থীদের যে দুর্ভোগ পোহাতে হয়, তা কখনো প্রকাশ পায় না। অন্যান্য দেশ যখন প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন আমাদের ভিসার জন্য অপেক্ষা করতে হয়। অনলাইনে ভিসা আবেদন করার সুযোগ থাকলেও, আমাদের জন্য তা সম্ভব নয়। দূতাবাসে সরাসরি উপস্থিত হতে হয়, যা অনেক সময় অন্য দেশে যেতে বাধ্য করে।

সম্প্রতি, একটি অলিম্পিয়াডের জন্য দলের একজন শিক্ষার্থীকে ভিসা দেওয়া হয়নি, ফলে আমরা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে পারিনি। অথচ আগের বছর আমরা সেখানে দুটি রৌপ্য ও দুটি ব্রোঞ্জপদক অর্জন করেছিলাম।

দলনেতা হিসেবে আমাকে ব্যর্থতা ব্যবস্থাপনায় অনেক কষ্ট করতে হয়। ফলাফল খারাপ হলে শিক্ষার্থীরা হতাশ হয়ে পড়ে এবং সমাপনী অনুষ্ঠানে যেতে চায় না। অন্য দেশের শিক্ষার্থীরা খারাপ ফলাফলের পর নিজেদের প্রস্তুতি নিয়ে চিন্তা করে, কিন্তু আমাদের শিক্ষার্থীরা হতাশায় ডুবে যায়।

আমাদের সুবিধা ও সামর্থ্য অনুযায়ী অর্জন উদ্‌যাপন করা উচিত, তবে শিক্ষার্থীদের পাশে থাকতে হবে যাতে তারা বুঝতে পারে, একটি পরীক্ষা বা প্রতিযোগিতা জীবনের সবকিছু নয়।

এটি শুধু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নয়, আমাদের সংস্কৃতিতেও প্রতিফলিত হচ্ছে। পরীক্ষার ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে চাপ সৃষ্টি হয়। প্রশ্ন হলো, আমরা কি আমাদের সন্তানদের যথাযথ সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছি?

একটি শিশু যে সারা দিন স্কুলে কাটাচ্ছে, তার খেলার জন্য কি আমরা মাঠ দিয়েছি? আমরা কি নিশ্চিত করতে পেরেছি যে, তার খাবারে ভেজাল নেই?

যুগের সঙ্গে তাল মেলানোর জন্য আইসিটি শিক্ষা যুক্ত করা হয়েছে, কিন্তু আইসিটির শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে কি? গণিতের ভালো শিক্ষক কয়টি স্কুলে আছেন?

যে কারণে আমরা খেলার মাঠ, পুষ্টিকর খাবার, চিকিৎসা, পরিবহন, শিক্ষক ও শিক্ষা উপকরণ দিতে পারি না, সেই কারণেই আমাদের শিশুদের কাছ থেকে অযৌক্তিকভাবে ভালো ফলাফলের আশা করা উচিত নয়।

এত প্রতিকূলতার মধ্যেও শিক্ষার্থীরা আশাজাগানিয়া ফলাফল করছে, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা। তবে ফলাফল আশানুরূপ না হলে, তাদের প্রতি নির্দয় হওয়ার আগে বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হবে।

প্রতিটি শিশুই আলাদা। তাদের সহপাঠী ভালো করছে মানে এই নয় যে, তাকেও একই পরিমাণ ভালো ফলাফল করতে হবে।

আমাদের সুবিধা ও সামর্থ্য অনুযায়ী অর্জন উদ্‌যাপন করা উচিত, কিন্তু পথ চলতে গিয়ে কোথাও হোঁচট খেলে, শিক্ষার্থীদের পাশে থাকতে হবে। তারা যেন বুঝতে পারে, একটি পরীক্ষা বা প্রতিযোগিতাই জীবনের সবকিছু নয়।