গত ১ জুন সকালে আনন্দ মোহন কলেজে গিয়েছিলাম। ১৯০৮ সালে ময়মনসিংহে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী এই কলেজটি আমার সাবেক কর্মস্থল। কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সামনে একটি ছোট বাগান রয়েছে, যেখানে বৈচিত্র্যময় উদ্ভিদ দেখা যায়। বাগানে প্রবেশ করতেই প্রথম নজরে আসে ঘণ্টার মতো ঝুলে থাকা সাদা-গোলাপি রঙের রাজঘণ্টা ফুল। ছবিও তুলে ফেললাম। এই ফুলের আরেক নাম রাজধুতুরা। ময়মনসিংহের সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ (মহিলা) ক্যাম্পাসেও রাজঘণ্টা ফুল দেখা গেছে।

রাজঘণ্টার বৈজ্ঞানিক নাম Brugmansia suaveolens, যা Solanaceae পরিবারের গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ। এটি প্রকৃতির এক অপূর্ব সৃষ্টি, যার নৈসর্গিক সৌন্দর্য ও তীব্র সুবাসের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। এই উদ্ভিদকে অ্যাঞ্জেলস ট্রাম্পেট নামেও ডাকা হয়। এর ঝুলন্ত ফুলগুলো দেখতে ঠিক যেন আকাশের দিকে মুখ করে থাকা কোনো রাজকীয় ঘণ্টা, আর এ কারণেই বাংলায় এর নামকরণ হয়েছে রাজঘণ্টা।

রাজঘণ্টা মূলত দক্ষিণ আমেরিকার ক্রান্তীয় অঞ্চলের উদ্ভিদ, বিশেষ করে ব্রাজিলের। তবে এর চমৎকার রূপ ও সুবাসের কারণে বর্তমানে বাংলাদেশ, ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বাগান ও পার্কে এটি শোভাবর্ধনকারী উদ্ভিদ হিসেবে পরিচিত। এটি আর্দ্র জলবায়ু এবং সুনিষ্কাশিত দোআঁশ মাটি পছন্দ করে।

রাজঘণ্টা একটি বহুবর্ষজীবী গুল্ম বা ছোট আকৃতির বৃক্ষ, যা সাধারণত ৩ থেকে ৫ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। এর পাতাগুলো বড়, ডিম্বাকার এবং কিছুটা খসখসে। তবে এর আসল আকর্ষণ হলো এর ফুল, যা সাধারণত সাদা, হালকা হলুদ বা গোলাপি রঙের হয়ে থাকে। একেকটি ফুল ২০ থেকে ৩০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে এবং গাছের ডালে সোজা হয়ে না ফুটে, নিচের দিকে মুখ করে ঝুলে থাকে। দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন গাছজুড়ে অসংখ্য রাজকীয় ঘণ্টা ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।

রাজঘণ্টার সবচেয়ে চমৎকার বৈশিষ্ট্য হলো এর তীব্র ও মিষ্টি সুবাস। দিনের বেলা এই ফুলে তেমন কোনো গন্ধ পাওয়া যায় না, কিন্তু সূর্য ডোবার পর থেকে এর সুবাস চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। মূলত রাতের নিশাচর পতঙ্গদের পরাগায়নের জন্য আকৃষ্ট করতেই রাজঘণ্টা রাতে তার সুবাসের ডালি উজাড় করে দেয়। এর তীব্র সুবাস নিশাচর মথদের পরাগায়নের জন্য সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করে। চমৎকার এই সুগন্ধের কারণে রাতে বাগানে এটি এক মায়াবী পরিবেশ তৈরি করে।

ঐতিহ্যগতভাবে কিছু উপজাতীয় সংস্কৃতিতে রাজঘণ্টার পাতা ও ফুল সীমিত পরিসরে ব্যথানাশক ও হাঁপানির উপশমকারী হিসেবে ব্যবহৃত হতো, তবে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে এর ব্যবহার অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত।

সৌন্দর্য এবং সুবাসের জন্য জনপ্রিয় হলেও রাজঘণ্টা অত্যন্ত বিষাক্ত একটি উদ্ভিদ। এই গাছের পাতা, ফুল, ফল ও বীজ—সব অংশেই স্কোপোলামিন ও অ্যাট্রোপিন নামক ক্ষতিকারক অ্যালকালয়েড থাকে। ভুলবশত এর কোনো অংশ শরীরে প্রবেশ করলে তীব্র বিভ্রম, পক্ষাঘাত, এমনকি মৃত্যুও হতে পারে। তাই বাড়িতে এই গাছ থাকলে শিশু এবং পোষা প্রাণীদের এর থেকে দূরে রাখা উচিত।

বিষাক্ত হওয়া সত্ত্বেও সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে রাজঘণ্টা বাগানের সৌন্দর্য বদলে দিতে পারে। এই গাছের প্রচুর সূর্যালোক ও নিয়মিত পানির প্রয়োজন হয়। বর্ষাকালের শেষে গাছ ছাঁটাই করে দিলে এর আকৃতি সুন্দর থাকে এবং পরবর্তী মৌসুমে প্রচুর ফুল ফোটে। ডাল কেটে সহজেই এই উদ্ভিদের বংশবৃদ্ধি করা যায়।

রাজঘণ্টা বা রাজধুতুরা প্রকৃতির এমন এক সৃষ্টি, যা একই সঙ্গে মোহনীয় ও বিপজ্জনক। এর ঝুলন্ত ফুলের রাজকীয় সৌন্দর্য আর রাতের মৃদু সুবাস যেকোনো প্রকৃতিপ্রেমীর মন ভরিয়ে দিতে বাধ্য। সঠিক সতর্কতা অবলম্বন করে বাগানের এক কোণে এই গাছ লাগালে তা আপনার বাগানকে অনন্য এক নান্দনিক মাত্রা দেবে।