একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন দিয়ে শুরু করা যাক। সমাজ কি নৈতিক প্রত্যাশা সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ করে? নাকি পেশা, লিঙ্গ ও সামাজিক পরিচয়ের ভিত্তিতে অসমভাবে বণ্টিত হয়?
সম্প্রতি সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জের পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিউটি রানী পালের ঘটনা ঘিরে যে ব্যাপক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে, তা শুধু সামাজিক সংহতির প্রকাশ নয়, এটি আবেগ, মর্যাদা এবং সামাজিক স্বীকৃতির রাজনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।
নারীবাদী দার্শনিক সারা আহমেদ বলেছিলেন, "আবেগ কখনোই শুধু ব্যক্তিগত অনুভূতি নয়, বরং ক্ষমতার সম্পর্ক গঠন ও পুনর্গঠনের একটি কার্যকর রাজনৈতিক শক্তিও বটে।"
বিউটি পালের কয়েক সেকেন্ডের একটি সাংস্কৃতিক রিলকে ঘিরে যে নৈতিক উদ্বেগ, ক্ষোভ ও নিন্দা তৈরি হয়েছে, তা শুধু ভিডিওর আলাপ নয়, বরং একজন নারী শিক্ষক কেমন হবেন, কীভাবে নিজেকে উপস্থাপন করবেন এবং তাঁর ব্যক্তিগত পরিসরের সীমা কোথায় শেষ হবে, এই সামাজিক কল্পনাকে রক্ষা করার প্রচেষ্টার অংশও। অন্যদিকে যাঁরা তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন, তাঁদের অবস্থানও ছিল সমানভাবে নৈতিক। তাঁরা মনে করিয়ে দিয়েছেন, শিক্ষক সবার আগে একজন মানুষ, তাঁরও ব্যক্তিগত অনুভূতি, সাংস্কৃতিক প্রকাশ এবং নাগরিক স্বাধীনতার অধিকার রয়েছে।
ইতিহাসবিদ এভলিন ব্রুকস হিগিনবোথাম ‘সম্মানযোগ্যতার রাজনীতি’ ধারণা ব্যবহার করে বলেছিলেন, সমাজ কিছু নির্দিষ্ট আচরণ, পোশাক, ভাষা ও জীবনযাপনকে সম্মানযোগ্যতার মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় নারী শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও একই প্রত্যাশা কাজ করে। তাঁদের পেশাগত দক্ষতা বা শিক্ষার্থীদের প্রতি দায়িত্ব যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক না কেন, জনপরিসরে তাঁদের গ্রহণযোগ্যতা প্রায়ই নির্ধারিত হয় তাঁরা কতটা সামাজিকভাবে নির্মিত ‘ভদ্রতা’, ‘সংযম’ ও ‘শালীনতা’-এর মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ—তার ওপর।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতাও একই বাস্তবতার দিকেই ইঙ্গিত করে। নারীদের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত জীবনকে পেশাগত পরিচয়ের সঙ্গে যেভাবে যুক্ত করে দেখা হয়, পুরুষদের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে সেটা অনেক কম। একজন নারী কী পরলেন, কীভাবে কথা বললেন কিংবা একটি গানের সঙ্গে কয়েক সেকেন্ডের একটি ভিডিও ধারণ করলেন—এসব বিষয় মুহূর্তের মধ্যেই তাঁর পেশাগত যোগ্যতা, নৈতিকতা কিংবা চরিত্রের আলোচনায় পরিণত হতে পারে। এর আগেও আমরা দেখেছি, একজন কলেজশিক্ষক টিপ পরাকে কেন্দ্র করে প্রকাশ্যে কটূক্তির শিকার হন।
এই পটভূমিতে প্রশ্ন জাগে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ব্যক্তিগত একটি ভিডিও ধারণ করলে সেটি কি নিজেই কোনো সুস্পষ্ট আইনি বা প্রশাসনিক বিধি লঙ্ঘন? বর্তমানে সরকারি কর্মচারীদের আচরণবিধি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের নির্দেশিকায় দায়িত্বশীল আচরণ, শালীনতা, মিথ্যা তথ্য প্রচার থেকে বিরত থাকা এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখার বিষয়গুলো উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ব্যক্তিগত একটি সাংস্কৃতিক ভিডিও ধারণকে নিষিদ্ধ করার মতো সুস্পষ্ট বিধান নেই। ফলে বিউটি পালের ঘটনাকে কেবল আইনের প্রশ্ন হিসেবে ব্যাখ্যা করা যথেষ্ট নয়, এটি সামাজিক নৈতিকতা, প্রশাসনিক ব্যাখ্যা এবং পেশাগত প্রত্যাশার জটিল আন্তসম্পর্কের প্রশ্নও।
তবে এখানেও সতর্ক থাকা জরুরি। অনলাইন বিদ্বেষের ভাষা নানা রাজনৈতিক অবস্থান, সামাজিক পরিচয় এবং মতাদর্শিক অবস্থান থেকে আসতে দেখা যায়। মতাদর্শ ভিন্ন হলেও নারীকে নিয়ন্ত্রণ করার ভাষা অনেক ক্ষেত্রে আশ্চর্যজনকভাবে একই রকম হয়ে ওঠে।
সমাজবিজ্ঞানী স্ট্যানলি কোহেনের ‘নৈতিক আতঙ্ক’ নামক ধারণা দিয়ে পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। তাঁর মতে, কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা ঘটনাকে কখনো কখনো এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যেন সেটিই সমাজের নৈতিক ভিত্তির জন্য এক বড় হুমকি। বিউটি পালের ঘটনায়ও এই প্রবণতার কিছু বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়। ফলে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে আর ভিডিওটা থাকল না, বরং একজন শিক্ষক কেমন হওয়া উচিত, এই সামাজিক কল্পনাই আলাপের মূল ইস্যু হয়ে উঠল।
একটি গণতান্ত্রিক সমাজে নৈতিক প্রশ্ন নিয়ে মতবিনিময়, সমালোচনা এবং ভিন্নমত প্রকাশ নাগরিক অধিকারেরই অংশ। কিন্তু যখন কোনো ব্যক্তিকে বাস্তব ঘটনার তুলনায় অতিরঞ্জিতভাবে সমাজের নৈতিক সংকটের প্রতীক বানিয়ে ফেলা হয়, অথবা যুক্তিসংগত সমালোচনা ব্যক্তিগত অপমান, চরিত্র হনন এবং সংঘবদ্ধ অনলাইন বিদ্বেষে রূপ নেয়, তখন সেই আলোচনা নৈতিক সংলাপের সীমা অতিক্রম করে নৈতিক আতঙ্কের রূপ নিতে পারে।
ডিজিটাল যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সামাজিক নজরদারি, নৈতিক শাসন এবং প্রতীকী শাস্তি প্রদানেরও একটি শক্তিশালী ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। এখন কেবল রাষ্ট্র বা কোনো প্রতিষ্ঠান নয়, সাধারণ নাগরিকও অন্যের আচরণ পর্যবেক্ষণ, মূল্যায়ন এবং প্রকাশ্যে বিচার করার ক্ষমতা অর্জন করেছেন।
"একটি গণতান্ত্রিক সমাজে শিক্ষক অবশ্যই দায়িত্বশীল হবেন। কিন্তু দায়িত্বশীলতা এবং সার্বক্ষণিক নৈতিক নজরদারি এক বিষয় নয়। যদি আমরা প্রতিটি সাংস্কৃতিক প্রকাশ, ব্যক্তিগত আনন্দ কিংবা মানবিক অনুভূতিকেই পেশাগত বৈধতার মানদণ্ডে পরিণত করি, তবে আমরা ধীরে ধীরে এমন একটি সমাজ নির্মাণ করার দিকেই এগিয়ে যাব, যেখানে মানুষ নয়, শুধু সামাজিকভাবে অনুমোদিত চরিত্রগুলোকেই টিকে থাকার সুযোগ দেওয়া হয়।"
নিঃসন্দেহে শিক্ষক একটি বিশেষ পেশা। কিন্তু সেই দায়িত্ব কি এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, যেখানে একজন শিক্ষক তাঁর মানবিক সত্তা, ব্যক্তিগত অনুভূতি কিংবা সাংস্কৃতিক আত্মপ্রকাশের অধিকার প্রায় হারিয়ে ফেলবেন? একজন শিক্ষকও গান শুনতে পারেন, ভ্রমণ করতে পারেন, হাসতে পারেন, ছবি তুলতে পারেন কিংবা সাংস্কৃতিক প্রকাশে অংশ নিতে পারেন। এসব কর্মকাণ্ড স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাঁর পেশাগত যোগ্যতা বা নৈতিকতার পরিমাপক হতে পারে না।
সমালোচনা গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ, কিন্তু সমালোচনা যখন ব্যক্তিগত অপমান, চরিত্র হনন এবং সংঘবদ্ধ অনলাইন ট্রলিংয়ে রূপ নেয়, তখন তা কেবল একজন ব্যক্তিকেই আঘাত করে না, বরং শিক্ষা-পরিবেশে ভয়, আত্মসংযম ও নীরবতার সংস্কৃতিও তৈরি করে। শিক্ষক সেই সমাজের নির্মাতা, কিন্তু তিনি কোনো দেবত্বপ্রাপ্ত নৈতিক প্রতিমূর্তি নন। তিনি ভুল করতে পারেন, শিখতে পারেন, আনন্দ করতে পারেন, কষ্ট পেতে পারেন—কারণ তিনিও একজন মানুষ।
সম্ভবত এ কারণেই আজ সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটি বিউটি পালকে নিয়ে নয়, বরং নিজেদের নিয়ে—আমরা কি শিক্ষককে একজন মানুষ হিসেবে গ্রহণ করতে প্রস্তুত, নাকি তাঁকে এমন এক নৈতিক প্রতিমূর্তি বানাতে চাই, যার মানবিক হওয়ার কোনো অধিকার নেই?
— ড. স্নিগ্ধা রেজওয়ানা
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক
(মতামত লেখকের নিজস্ব)