রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর দফায় দফায় হামলা এবং হবিগঞ্জে এনসিপির গাড়িবহরে আক্রমণের ঘটনা কেবল উদ্বেগজনকই নয়, বরং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) এক নেতার নেতৃত্বে মব সহিংসতার যে নজির তৈরি হলো এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দিতে যেভাবে ব্যর্থ হয়েছে, তাতে প্রশ্ন জাগে বিশ্ববিদ্যালয়টি কি ‘মবের মুল্লুকে’ পরিণত হয়েছে? একইভাবে হবিগঞ্জে বিরোধী দলের ওপর হামলা ও পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা এবং ক্ষমতার দাপটের পুরোনো চর্চাকেই পুনরায় সামনে নিয়ে এসেছে।

মুক্তকণ্ঠের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রেমের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় এক নারী শিক্ষার্থীকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ থেকে ঘটনার সূত্রপাত। এই বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তদন্ত কমিটি গঠন না করে সালিস বৈঠক বসানোর কারণেই সোমবারের এই দুঃখজনক ঘটনাটি ঘটেছে। রাকসুর সাধারণ সম্পাদক সালাউদ্দিন আম্মারের নেতৃত্বে ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীরা যেভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনজন শিক্ষার্থীকে নির্মমভাবে পিটিয়েছেন, তা এককথায় ফৌজদারি অপরাধ। সবচেয়ে পরিতাপের বিষয় হলো, প্রথম দফায় মারধর করা হয়েছে প্রক্টরের দপ্তরেই। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পাঠকক্ষে আশ্রয় নেওয়া শিক্ষার্থীদের কাঠ, বাঁশ, রড ও বেল্ট দিয়ে পিটিয়ে আহত করা হয়। এমনকি সেখানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরাও হামলার শিকার হয়েছেন। এ ধরনের বেপরোয়া হামলা নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের আমলের কথা মনে করিয়ে দেয়।

একজন শিক্ষার্থীর মুঠোফোন তল্লাশি করে ছাত্রলীগের নেতাদের সঙ্গে ছবি দেখে তাঁকে ‘ছাত্রলীগ তকমা’ দিয়ে আক্রমণ করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ব্যক্তিগত মুঠোফোন ঘেঁটে দেখা গোপনীয়তার চরম লঙ্ঘন। এছাড়া মারধরের শিকার দুজন শিক্ষার্থীকে নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড সংক্রান্ত পুরনো মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর ঘটনাটিও নিন্দনীয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সালাউদ্দিন আম্মারের নেতৃত্বে মব সহিংসতার ঘটনা এটিই প্রথম নয়। পূর্বের ঘটনাগুলোতে সুষ্ঠু তদন্ত ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হলে এই সহিংসতার পুনরাবৃত্তি হতো না।

অন্যদিকে, হবিগঞ্জে এনসিপির সমাবেশ শেষে দলটির নেতা-কর্মীদের ওপর ক্ষমতাসীন বিএনপি ও ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের হামলা রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। মঙ্গলবারের এই হামলায় অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন। বিএনপি ও ছাত্রদলের স্থানীয় নেতা-কর্মীরা দাবি করেছেন, সমাবেশে উসকানিমূলক বক্তব্যের কারণে এমন ঘটনা ঘটেছে। তবে এই দাবি হাস্যকর ও অগ্রহণযোগ্য। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে যেকোনো বক্তব্যের জবাব বক্তব্য দিয়েই দিতে হয়, গায়ের জোর দিয়ে নয়। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ আমলে বিরোধী দলগুলোর রাজনৈতিক কর্মসূচিতে হামলা চালানো হতো এবং এর সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী ছিল বিএনপি। তাই ক্ষমতাসীন দল বিএনপির কাছ থেকে একই আচরণ কোনোভাবেই কাম্য নয়।

এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে পাল্টাপাল্টি সমাবেশ ডাকাও গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা মনে করি, এনসিপির নেতা-কর্মীদের ওপর যারা হামলা চালিয়েছে, বিএনপি ও পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেবে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক যাত্রা শুরু হলেও ভেঙে পড়া অর্থনীতি পুনর্গঠনে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন স্থিতিশীলতা। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মব সহিংসতা এবং হবিগঞ্জে বিরোধীদের ওপর হামলার মতো ঘটনা সেই স্থিতিশীলতাকে নষ্ট করতে পারে। তাই সরকারকে অবশ্যই কঠোরভাবে এই ধরনের সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।