চট্টগ্রাম নগরের চান্দগাঁও থানার খাজা রোড এলাকায় দুটি কুকুরকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনাটি কেবল প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা নয়, বরং আমাদের সমাজের আইন, নৈতিকতা ও মানবিকতার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে গভীর প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। কোনো প্রাণী মানুষের জন্য ঝুঁকি সৃষ্টি করলেও তাকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা করার অধিকার কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নেই। সভ্য সমাজে এ ধরনের আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, একটি কুকুরকে মাটিতে ফেলে লাঠি দিয়ে আঘাত করা হচ্ছে এবং আশপাশে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন ব্যক্তি নির্বিকারভাবে পুরো ঘটনাটি দেখছেন। সেখানে আরেকটি কুকুরের নিথর দেহ পড়ে থাকার দৃশ্যটি প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতার পাশাপাশি আমাদের সামাজিক সংবেদনশীলতার চরম অবক্ষয়কেও ফুটিয়ে তুলেছে। সহিংসতাকে যখন মানুষ স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করতে শুরু করে, তখন সেই প্রবণতা প্রাণী থেকে মানুষের প্রতিও ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। তাই এই ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
প্রাণী অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, অভিযুক্তদের পরিচয় এবং ঘটনার ভিডিও থাকা সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উল্টো অভিযোগকারীদের আদালতে মামলা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এই পরিস্থিতি একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে—প্রাণিকল্যাণ আইন, ২০১৯ বাস্তবায়নের দায়িত্ব আসলে কার? প্রতিটি ঘটনায় যদি সংক্ষুব্ধ নাগরিককে নিজ উদ্যোগে আদালতে যেতে হয়, তবে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার ভূমিকা কোথায়?
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, কুকুর দুটি শিশুদের কামড়েছিল এবং হাঁস-মুরগি মেরে ফেলেছিল। তবে এমন অভিযোগ থাকলেও নির্মম হত্যা কখনোই কোনো সমাধান হতে পারে না। এই ঘটনায় জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা তদন্তের আশ্বাস দিয়েছেন। তবে সেই তদন্ত যেন কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। ভিডিওসহ ডিজিটাল প্রমাণ যাচাই করে প্রকৃত দোষীদের শনাক্ত করতে হবে এবং প্রয়োজনে পুলিশের সাইবার ইউনিট ও স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তা নিতে হবে।
এই ঘটনাটি মনে করিয়ে দেয় যে, বাংলাদেশে প্রাণিকল্যাণ আইন থাকলেও তার প্রয়োগ এখনো দুর্বল। আইন কার্যকর করতে হলে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকারি প্রতিষ্ঠান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং প্রাণী অধিকার সংগঠনগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন। একইসঙ্গে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রাণীর প্রতি সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধ তৈরিতে সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি।
দুটি কুকুরের মৃত্যু অনেকের কাছে তুচ্ছ মনে হতে পারে, কিন্তু একটি সমাজের সভ্যতার মাপকাঠি নির্ধারিত হয় দুর্বল ও নির্বাক প্রাণীর প্রতি তার আচরণের মাধ্যমে। তাই এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা এবং প্রাণিকল্যাণ আইন, ২০১৯-এর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন।