হবিগঞ্জ জেলায় আধিপত্য বিস্তার, জমিজমা বিরোধ, পারিবারিক ও সামাজিক দ্বন্দ্ব এবং স্থানীয় প্রভাব বিস্তারের লড়াইয়ে একের পর এক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত প্রথম ছয় মাসে এসব রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে অন্তত ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন ৭৭৭ জন।
জেলা পুলিশের দেওয়া তথ্যানুসারে, গত ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন উপজেলায় মোট ৯৪টি সংঘর্ষের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে লাখাই, বানিয়াচং, বাহুবল ও হবিগঞ্জ সদর উপজেলাগুলো সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
এই সহিংসতায় কেবল প্রাণহানিই ঘটেনি, বরং বহু পরিবার তাদের প্রধান উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়েছে। আহতদের দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা এবং মামলা-মোকদ্দমার পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে গিয়ে অনেক পরিবার আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। অনেকে চিকিৎসার খরচ মেটাতে জমি বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন অথবা ঋণের জালে জড়িয়ে পড়েছেন।
উপজেলাভিত্তিক পরিসংখ্যান 살펴보লে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি সংঘর্ষ ঘটেছে লাখাই উপজেলায়। সেখানে ২৩টি ঘটনায় ৩ জন নিহত এবং ১৬৬ জন আহত হয়েছেন। প্রাণহানির দিক থেকে শীর্ষে বানিয়াচং উপজেলা, যেখানে ২০টি সংঘর্ষে ৭ জনের মৃত্যু এবং ১৩১ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া বাহুবল উপজেলায় ১৪টি সংঘর্ষে ১০১ জন এবং হবিগঞ্জ সদর উপজেলায় ১২টি সংঘর্ষে ১৭৯ জন আহত হয়েছেন।
অন্যান্য উপজেলার হিসেবে, নবীগঞ্জ উপজেলায় ৯টি ঘটনায় ২ জন নিহত ও ৬৩ জন আহত, আজমিরীগঞ্জ উপজেলায় ৭টি ঘটনায় ২ জন নিহত ও ৫৫ জন আহত এবং মাধবপুর উপজেলায় ৭টি ঘটনায় ২ জন নিহত ও ২৯ জন আহত হয়েছেন। চুনারুঘাট উপজেলায় ২টি সংঘর্ষে ৩ জন আহত হলেও কোনো প্রাণহানি ঘটেনি। তবে শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলায় গত ছয় মাসে কোনো সংঘর্ষের রেকর্ড পাওয়া যায়নি।
মাসিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে সহিংসতার মাত্রা বেড়েছে। জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত ৪৩টি সংঘর্ষে ৪ জন নিহত ও ৩৬৫ জন আহত হলেও, এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত ৫১টি ঘটনায় ১২ জন নিহত ও ৪১২ জন আহত হয়েছেন।
এ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) জেলা সভাপতি অ্যাডভোকেট ত্রিলোক কান্তি চৌধুরী বিজন। তিনি বলেন, "জেলার অধিকাংশ সংঘর্ষের পেছনে রয়েছে জমিজমা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক ও সামাজিক দ্বন্দ্ব এবং তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা। অনেক ক্ষেত্রে ছোটখাটো বিরোধও মুহূর্তে রক্তক্ষয়ী রূপ নিচ্ছে। এতে বহু পরিবার অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে।"
সামাজিক বন্ধন শিথিল হয়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, "আগে যে সামাজিক বন্ধন ছিল এবং যারা সমাজে নেতৃত্ব দিতেন, তাদের প্রতি মানুষের যে সম্মান ও আস্থা ছিল, তা এখন অনেকটাই কমে গেছে। ফলে মারামারি বা সংঘর্ষ ঘটলেও তা নিয়ন্ত্রণে কেউ সহজে এগিয়ে আসেন না। সংঘর্ষ নিয়ন্ত্রণে প্রথমেই দেশীয় অস্ত্র তৈরির প্রবণতা ও মজুত বন্ধ করতে হবে।"
জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট মঞ্জুর উদ্দিন শাহিন জানান, অত্যন্ত তুচ্ছ বিষয় যেমন টমটমের ভাড়া, ছোটখাটো ঝগড়া বা ফুটবল খেলা নিয়েও এখন মারামারি হচ্ছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে পঞ্চায়েত-সর্দার কে হবেন, তা নিয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘাত ঘটছে। এমনকি আদালত চত্বরেও প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে, যা মানুষকে আইনি জটিলতা ও আর্থিক ক্ষতির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এই সামাজিক অবক্ষয় রোধে সচেতনতা ও স্থানীয় বিরোধ মীমাংসার উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
হবিগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. তারেক মাহমুদ জানান, সংঘর্ষপ্রবণ এলাকায় নিয়মিত অভিযান, গোয়েন্দা নজরদারি এবং বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।
আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে পুলিশ সুপার বলেন, "যে কোনো উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে দ্রুত প্রশাসনকে জানাতে হবে। স্থানীয়ভাবে বিরোধ নিষ্পত্তির কার্যকর উদ্যোগ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহযোগিতা করলে সংঘর্ষ ও প্রাণহানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব।"