নিজেকে প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করার পর ৩ জুলাই প্রথমবারের মতো আসিয়ান দেশ লাওস সফর করেন মিয়ানমারের সামরিক শাসক মিন অং হ্লাইং। এই সফরের পর পুনরায় একটি পুরনো বিতর্ক সামনে এসেছে। অনেকের মতে, মিয়ানমারে বর্তমানে কোনো একক সরকার নেই, বরং সেখানে সামরিক জান্তা, জাতিসংঘে প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিরোধপন্থীরা, নির্বাসিত জাতীয় ঐক্য সরকার এবং বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী ও স্থানীয় মিলিশিয়াদের মতো একাধিক শক্তি সক্রিয়।

এই পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে অনেকের ধারণা, বহিঃবিশ্বের উচিত প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে কাজ করা। যেমন—সীমান্ত নিরাপত্তার জন্য এক পক্ষ, সম্পদের জন্য অন্য পক্ষ এবং অপরাধ দমনে ভিন্ন কোনো পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা। তবে এই যুক্তি আপাতদৃষ্টিতে সহজ মনে হলেও বাস্তবে এটি জান্তার পক্ষেই কাজ করে, কারণ আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও দূতাবাসের সুযোগ তাদের হাতেই বেশি।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ধারণার পেছনে তিনটি বড় সমস্যা রয়েছে। প্রথমত, মিয়ানমার কোনো বিশৃঙ্খল রাষ্ট্র নয়। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, জান্তার নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত সীমিত; তারা দেশের মাত্র ২১ শতাংশ এলাকা কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। বাকি দুই-তৃতীয়াংশ এলাকা বিভিন্ন সংগঠনের অধীনে, যাদের নিজস্ব প্রশাসন, আইন ও রাজনৈতিক কাঠামো রয়েছে। একে কেবল ‘যুদ্ধবাজদের দখল’ না বলে ফেডারেল রাজনীতির একটি উদীয়মান রূপ হিসেবে দেখা উচিত।

দ্বিতীয়ত, এই ধারণাটি একটি বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনকে উপেক্ষা করে। ২০২৬ সালের ৩০ মার্চ জাতীয় ঐক্য সরকার, পিদাউংসু হ্লুত্তাও প্রতিনিধিত্বকারী কমিটি এবং চারটি বড় জাতিগত সংগঠনের সমন্বয়ে ‘ফেডারেল গণতান্ত্রিক ইউনিয়ন গঠনের স্টিয়ারিং কাউন্সিল’ গঠিত হয়। এই জোটের লক্ষ্য সামরিক শাসনের অবসান, সব বাহিনীকে বেসামরিক নিয়ন্ত্রণে আনা, ২০০৮ সালের সংবিধান বাতিল করে নতুন ফেডারেল সংবিধান তৈরি, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন এবং অতীতের অপরাধের বিচার নিশ্চিত করা। বর্তমানে ব্যাংকক, টোকিও ও অটোয়াসহ বিভিন্ন স্থানে তাদের কূটনৈতিক যোগাযোগ চলছে। এটি কেবল ভাঙন নয়, বরং যুদ্ধের মধ্যেই একটি নতুন রাষ্ট্র গড়ার প্রচেষ্টা।

তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে যোগাযোগ করা আর স্বীকৃতি দেওয়ার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। চীন ও ভারতের মতো দেশগুলো বাস্তব প্রয়োজনে বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখলেও স্বীকৃতি দেওয়া ভিন্ন বিষয়। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী স্বীকৃতির জন্য সাংবিধানিক বৈধতা এবং আন্তর্জাতিক আইন মানার ইচ্ছা প্রয়োজন, যার উভয় ক্ষেত্রেই সামরিক জান্তা ব্যর্থ। ২০২০ সালের নির্বাচিত সরকারকে সরিয়ে দেওয়া এবং ২০২৫ সালের অগ্রহণযোগ্য নির্বাচনের কারণে তাদের কোনো বৈধতা নেই।

অন্যদিকে, স্টিয়ারিং কাউন্সিল ও তাদের সহযোগীদের মধ্যে ন্যায়বিচার ও সুরক্ষার সম্ভাবনা বিদ্যমান। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি দুই পক্ষকে সমানভাবে দেখে, তবে এই সম্ভাবনা দুর্বল হয়ে পড়বে। তবে কিছু দেশ ইতিমধ্যে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে। যেমন— "ফিলিপাইন প্রকাশ্যে অং সান সু চির সঙ্গে দেখা করার দাবি জানিয়েছে। তিমুর-লেসতে যুদ্ধাপরাধের বিচার চেয়েছে। এ জন্য তাদের কূটনীতিক বহিষ্কৃত হয়েছেন। সিঙ্গাপুরও তার অবস্থান পরিবর্তন করেনি। এ অবস্থানগুলো চরম নয়; বরং এগুলো একটি রাজনৈতিক সমাধানের পথ খোলা রাখে।"

পরিশেষে, মূল প্রশ্নটি মিয়ানমারে একক সরকার আছে কি না তা নয়; বরং প্রশ্নটি হলো—দেশটি যে নতুন সরকার গড়ার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, বিশ্ব কি তা দেখছে এবং যারা জনগণের জন্য কাজ করতে সক্ষম, সেই শক্তির পাশে কি বিশ্ব দাঁড়াবে?