১১টি সরকারি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে এবং নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব পদে বিএনপি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ নিয়ে নানা প্রশ্ন, বিতর্ক ও সমালোচনা সামনে এসেছে। প্রশাসনে দলীয়করণের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে—এমন মূল্যায়নও করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, সরকারি দলে থাকা পক্ষের জন্য এ ধরনের সিদ্ধান্ত ‘আত্মঘাতী’ হয়ে উঠতে পারে।

নতুন করে নিয়োগ পাওয়া ১১ জনের মধ্যে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটি বা সহযোগী সংগঠনের বর্তমান ও সাবেক নেতাদেরই দেখা গেছে। বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের চেয়ারম্যান পদে বিএনপির বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক রাজশাহীর সাবেক মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল; বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের

(বিআইডব্লিউটিসি) চেয়ারম্যান পদে দলের সহধর্মবিষয়ক সম্পাদক আবদুল বারী এবং বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের (বিসিসিটি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে দলের সহ–বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক কাজী রওনাকুল ইসলাম নিয়োগ পেয়েছেন।

এ ছাড়া বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের চেয়ারম্যান পদে যুবদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সহসভাপতি জাকির হোসেন এবং বাংলাদেশ জুট করপোরেশনের চেয়ারম্যান পদে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মামুন হাসানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ শ্রমিককল্যাণ ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক করা হয়েছে সালাহ্উদ্দিন সরকারকে। তিনি জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির কার্যকরী সভাপতি।

বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে বিএনপির আন্তর্জাতিক–বিষয়ক সম্পাদক মোহাম্মদ রাশেদুল হককে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদের নির্বাহী সচিব পদে নিয়োগ পেয়েছেন যুবদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সহসভাপতি মো. কামরুজ্জামান।

বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশনের চেয়ারম্যান পদে বিএনপির রংপুর বিভাগীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক আবদুল খালেক এবং বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশনের চেয়ারম্যান পদে দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য শামসুজ্জামানকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ পেয়েছেন বেনজীর আহমেদ। তিনি বিএনপির ঢাকা বিভাগীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক।

নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব পদে নিয়োগ পাওয়া মো. সামসুল আলমের দলীয় কোনো পদ না থাকলেও তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নি‍র্বাচনের পূ‍র্বে বিএনপির সংসদীয় আসন পুর্নবিন্যাস কমিটির সদস্য ছিলেন। (সংসদীয় আসনের নতুন সীমানা ইস্যুতে বিএনপির ৫ সদস্যের কমিটি, যুগান্তর, ৩ আগস্ট ২০২৫)

বিএনপির সূত্রগুলো জানিয়েছে, বিগত সরকারের সময়ে আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা রাখা এসব নেতাদের অনেকেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। কেউ মনোনয়ন পাননি, কাউকে দলের সিদ্ধান্তে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে হয়েছিল। এখন তাঁদের এভাবে মূল্যায়ন করা হলো। (সরকারি প্রতিষ্ঠানে দলীয় নিয়োগ দিয়ে কী বার্তা দিচ্ছে সরকার, মুক্তকণ্ঠ অনলাইন, ২৭ জুলাই ২০২৬)

সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৪৯ ধারা সরকারকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ক্ষমতা দিয়েছে। তাই এসব নিয়োগকে বেআইনি বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। তবে আইনটির এই বিধান মূলত ব্যতিক্রমী পরিস্থিতির জন্য। সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তগুলো দেখে মনে হচ্ছে, ব্যতিক্রমই এখন নিয়মে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আইন শেষ কথা নয়—এ কথা বারবারই সামনে আসে। নৈতিকতা, সুশাসন এবং স্বার্থের সংঘাত এড়ানোর বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। যদি এমন ধারণা বিস্তার লাভ করে যে রাজনৈতিক আনুগত্যই রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পাওয়ার অন্যতম যোগ্যতা, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জনগণের আস্থা দুর্বল হতে পারে।

এই নিয়োগগুলো নিয়ে প্রশাসনের ভেতরে অস্বস্তি তৈরির বিষয়টিও গণমাধ্যমে আলোচিত হয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন ক্যাডারের কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করে জানিয়েছেন, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের সংখ্যা বাড়ায় পদোন্নতির স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে অনেকে মনে করছেন। (সরকারি দপ্তর-সংস্থায় সরকারদলীয় নেতাদের নিয়োগ, প্রশাসনে অস্বস্তি, সমকাল, ২৭ জুলাই ২০২৬)

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলদেশের নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘একসঙ্গে এতগুলো সরকারি সংস্থার নেতৃত্বস্থানীয় পদে দলীয় ব‍্যক্তিদের নিয়োগ উদ্বেগজনক। শুরু থেকেই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের মতো নজরদারি সংস্থার শীর্ষ পদ থেকে স্থানীয় সরকারের প্রশাসক, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে যত নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, সব ক্ষেত্রেই দলীয় ক্ষমতার একচ্ছত্র আধিপত্যের সংস্কৃতি অনুসরণ করা হয়েছে। এসবের মাধ্যমে সরকার পরিষ্কারভাবে যে বার্তা দিচ্ছে, তা হলো এবার আমাদের পালা। এটা যে চূড়ান্ত বিবেচনায় আত্মঘাতী হবে, তারা সেটা উপলব্ধি করছে না।’

আলোচিত এই নিয়োগকে কেন্দ্র করে এরই মধ্যে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। জাতীয় সংসদের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী এটিকে নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য হুমকি হিসেবে আখ্যা দিয়ে তাঁর নিয়োগ বাতিলের দাবি জানিয়েছে।

এই নিয়োগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে মো. সামসুল আলমের নিয়োগ। তিনি উপসচিব হিসেবে অবসরে গিয়েছিলেন। লক্ষণীয় হলো, তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপির সংসদীয় আসন পুনর্বিন্যাস-সংক্রান্ত কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন; তাঁকেই নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে এক বছরের চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। সংবিধানের ১১৮(৪) অনুচ্ছেদ অনুয়ায়ী, নির্বাচন কমিশন দায়িত্বপালনে স্বাধীন থাকবে এবং শুধু সংবিধান ও আইনের প্রতি দায়বদ্ধ থাকবে। স্বাধীনতার এ ধারণা এবং কমিশনের ওপর জন-আস্থাই বাংলাদেশের গোটা নির্বাচনী ব্যবস্থার মূল ভিত্তি। জনগণ যদি মনে করেন, কমিশনের প্রশাসনিক নেতৃত্ব রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত, তাহলে কমিশনের প্রতি আস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে।

নির্বাচন কমিশনের এই নিয়োগ সম্পর্কে জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সভাপতি বদিউল আলম মজুমদার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিব পদটি প্রশাসনিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন পরিচালনাসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, ভোটার তালিকা প্রণয়ন থেকে শুরু করে নির্বাচন কমিশনের দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনায় এই পদের ভূমিকা অপরিসীম। দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট  কাউকে এমন স্পর্শকাতর পদে বসানো নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে জনমনে সংশয় তৈরি করতে বাধ্য। এই সিদ্ধান্ত আসন্ন স্থানীয় সরকার নি‍র্বাচনকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিতে পারে।’

আলোচিত এই নিয়োগকে কেন্দ্র করে এরই মধ্যে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। জাতীয় সংসদের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী এটিকে নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য হুমকি হিসেবে আখ্যা দিয়ে তাঁর নিয়োগ বাতিলের দাবি জানিয়েছে। (ইসি সচিবালয়ে ‘দলীয় ব্যক্তিকে’ নিয়োগ দেওয়া নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য হুমকি: জামায়াত, ইত্তেফাক, ২৬ জুলাই ২০২৬)

এ নিয়োগের রাজনৈতিক তাৎপর্য সম্পর্কে জানতে চাইলে বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘বাংলাদেশে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে সংশয় বারবার নির্বাচন বর্জনের রাজনীতিকে উসকে দিয়েছে। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪, ২০২৪-এর নির্বাচনগুলো তার প্রমাণ। বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় বিএনপি দীর্ঘদিন নির্বাচন কমিশনে দলীয় নিয়োগকে নির্বাচন বর্জনের অন্যতম যুক্তি হিসেবে উপস্থাপন করেছে। কিন্তু নিজেরা ক্ষমতায় গিয়ে সেই পথই অনুসরণ করছে। এই সিদ্ধান্ত বিএনপির জন্য যেমন আত্মঘাতী, তেমনি বাংলাদেশর গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্যও অশনিসংকেত। আমি আশা করব, বিএনপি তাদের ৩১ দফা ও নির্বাচনী ইশতেহারের  প্রতি সম্মান দেখিয়ে অবিলম্বে এই নিয়োগ বাতিল করবে।’

মনজুরুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠর জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক
*মতামত লেখকের নিজস্ব