নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. সামসুল আলমের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য ঘোষণার প্রস্তাব পুনর্বিবেচনাসহ মোট ৯ দফা দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।

বুধবার জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের নেতৃত্বে দলটির একটি প্রতিনিধিদল নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠক করে এসব দাবি উত্থাপন করে। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সামনে দাবিগুলোর কথা তুলে ধরে মিয়া গোলাম পরওয়ার কমিশনের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

তিনি জানান, বৈঠকে প্রধানত চারটি বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। সামসুল আলমের নিয়োগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক ব্যক্তি সামসুল আলমকে ইসির অতিরিক্ত সচিব পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ইসি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। এখানে রাজনৈতিক ব্যক্তির নিয়োগ যেকোনো নির্বাচনকে নিরপেক্ষ করার ব্যাপারে অন্তরায়। সামসুল আলম বিএনপির নির্বাচনী আসন পুনর্নির্ধারণ কমিটির সদস্য ছিলেন। তাঁর নিয়োগ বাতিল করতে হবে।’

মিয়া গোলাম পরওয়ার আরও বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচন আসন্ন। এই প্রেক্ষাপটে ক্ষমতাসীন দলের একটা গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী জায়গায় রাজনৈতিক দায়িত্ব পালন করা ব্যক্তিকে ইসির মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত সচিব পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কারণ, তিনি যাতে সরকারি দলের লোকদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিজয়ী করে নিয়ে আসতে পারেন।’

জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল জানান, সামসুল আলমের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে ইসি তাদের অজ্ঞতার কথা জানালেও নিয়োগটি সরকার দিয়েছে বলে উল্লেখ করে। 이에 জবাবে জামায়াতের পক্ষ থেকে বলা হয়, ইসি এই নিয়োগে আপত্তি জানাতে পারত। এই পরিস্থিতিতে ইসির কথায় অসহায়ত্ব, অক্ষমতা ও অপরগতার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে বলে তিনি দাবি করেন।

সম্প্রতি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অযোগ্য করার একটি প্রস্তাব চূড়ান্ত করেছে নির্বাচন কমিশন, যার তীব্র আপত্তি জানিয়েছে জামায়াত। মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ইতিহাসে শিক্ষকেরা বরাবরই অংশ নিয়েছেন এবং জাতীয় নির্বাচনে তাদের জন্য কোনো বিধিনিষেধ নেই। তিনি বলেন, ‘একটা নির্বাচন এই শিক্ষকেরা করতে পারবেন, আরেকটা পারবেন না, এটা একটা বৈষম্য। সংবিধানে নাগরিক অধিকারের খেলাপ।’ ইসি জানিয়েছে, বিষয়টি তারা আলোচনা করে দেখবে।

এছাড়া কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলের পদধারী নেতাদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হতে অযোগ্য ঘোষণা করার দাবি পুনরায় জানায় জামায়াত। মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘ব্যক্তির নির্বাচন করাটাও একটা রাজনীতি। ফলে পদ-পদবিধারী নিষিদ্ধ দলের কোনো ব্যক্তির এই নির্বাচনে অংশগ্রহণকেও নিষিদ্ধ করতে হবে।’ একইসঙ্গে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের প্রশাসকদেরও নির্বাচনে অযোগ্য করার দাবি জানানো হয়। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘স্থানীয় সরকারের পদে থেকে দুই-পাঁচ-দশ মাস কাজ করে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া মানেই হচ্ছে, এই নির্বাচনকে নিরপেক্ষ হতে দেওয়া হলো না। দলীয়করণের জন্যই তাঁকে (প্রশাসক) এখানে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। এটা একটা দলীয় নির্বাচন হবে, পক্ষপাতিত্ব হবে, এটা নিরপেক্ষ হবে না, স্বচ্ছ হবে না।’

স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সময় নিয়ে মন্ত্রীদের বক্তব্য এবং সর্বোচ্চ আদালতের রায় ঘোষণার দিনই চট্টগ্রাম-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী সরোয়ার আলমগীরের গেজেট প্রকাশের সমালোচনা করেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, ‘স্বাক্ষর করা আদেশ আসা পর্যন্ত ইসি অপেক্ষা করেনি। তারা একটা গেজেট জারি করে শপথের ব্যবস্থা করে দিল। ইসি রাজনৈতিক চাপে ছিল।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘তো উনাদের (ইসি) কথাবার্তায় তো আর ওই ভাষায় তো আর স্বীকার করবেন না। বডি ল্যাঙ্গুয়েজে বোঝা যায় যে তাঁরা আন্ডার প্রেশারে এটা করতে বাধ্য হয়েছেন।’

জামায়াতের এই নেতা উল্লেখ করেন, ইসি একটি স্বাধীন ও ক্ষমতাধর সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হওয়া সত্ত্বেও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দায়িত্ব পালনে তারা ব্যর্থ হয়েছেন, যা তারা বিনয়ের সঙ্গে স্বীকার করেছেন।

বৈঠকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ, তাহমিদা আহমদ এবং নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ। জামায়াতের পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ, কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য জসিম উদ্দীন সরকার ও শিশির মোহাম্মদ মনির প্রমুখ।