চট্টগ্রামের আলোচিত শীর্ষ সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড ইমন তার তিন সহযোগীসহ যশোর শহর থেকে গ্রেপ্তার হয়েছেন। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশ জানতে পেরেছে, তিনি বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন।

মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) রাত ৪টার দিকে যশোর শহরের ঝুমঝুমপুর এলাকা থেকে ডেভিড ইমন ও তার সহযোগীদের আটক করা হয়। পুলিশ জানায়, ওই এলাকায় চেকপোস্ট বসিয়ে যশোর জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও যশোর কোতোয়ালি থানার সমন্বয়ে গঠিত ৯ সদস্যের একটি বিশেষ দল অভিযান চালায়। বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশের উদ্দেশ্যে এলাকাটি অতিক্রম করার সময় তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।

যশোর জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও তদন্ত) মিরাজুল ইসলাম বলেন, "গোপন সংবাদের ভিত্তিতে চেকপোস্ট বসিয়ে বিশেষ অভিযান চালানো হয়। অভিযানে ডেভিড ইমনকে তার তিন সহযোগীসহ গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক আইনি প্রক্রিয়া শেষে করে তাদেরকে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।"

গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ডেভিড ইমন পুলিশকে জানান, "তিনি চিকিৎসার উদ্দেশ্যে ভারতে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন।"

যশোরের পুলিশ সুপার (এসপি) সৈয়দ রফিকুল ইসলাম জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ঝুমঝুমপুর এলাকায় নজরদারি ও চেকপোস্ট বসিয়ে অভিযান চালানো হয়। অভিযানে ডেভিড ইমন ও তার তিন সহযোগীকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে বুধবার সকাল ১০টার দিকে তাদের চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

পুলিশ ও তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর গ্রামের বাসিন্দা মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড ইমন সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদ গ্রুপের সক্রিয় সদস্য। চট্টগ্রামের একাধিক আলোচিত হত্যা, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এবং অস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনায় তার নাম সামনে আসে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অস্ত্র হাতে তার ছবি ছড়িয়ে পড়ার পর তিনি ব্যাপক আলোচনায় আসেন।

গত বছরের ৩০ মার্চ চট্টগ্রাম শহরের চন্দনপুরা এক্সেস রোডের মুখে প্রাইভেট কারে গুলি করে জোড়া খুন, ২৩ মে পতেঙ্গা সৈকতে সন্ত্রাসী ঢাকাইয়া আকবর খুন এবং ৫ নভেম্বর সরোয়ার হোসেন বাবলা খুনের ঘটনায় ডেভিড ইমনের নাম উঠে আসে। এছাড়া চলতি বছরের ১৩ জুলাই চট্টগ্রামে ‘ডিজিটাল ডটনেট (ডিডিএন)’ নামক ইন্টারনেট সেবাদাতা কোম্পানিতে হামলা, ভাঙচুর এবং ৩৫ লাখ টাকা ও মালপত্র লুটের ঘটনায় তিনি পুনরায় আলোচনায় আসেন।

মুক্তকণ্ঠের অনুসন্ধানে জানা গেছে, ডেভিড ইমন আন্ডারওয়ার্ল্ডের একটি ‘থ্রি-টায়ার’ বা তিন স্তরের সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত। অপরাধ বিশ্লেষক ও সিএমপির গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মতে, এই চক্রটি ভয়ের ওপর ভিত্তি করে কোটি কোটি টাকার অপরাধ সাম্রাজ্য পরিচালনা করে।

এই কাঠামোর প্রথম স্তরে রয়েছেন সাজ্জাদ হোসেন খান (বড় সাজ্জাদ) এবং হাবীব খানের মতো শীর্ষ সন্ত্রাসীরা, যারা বর্তমানে ফ্রান্স বা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক আশ্রয়ে বা আত্মগোপনে আছেন। তারা ইন্টারনেট কলিং অ্যাপের মাধ্যমে নির্দেশ দেন এবং চাঁদা দাবি করেন।

দ্বিতীয় স্তরে রয়েছেন ‘হোয়াইট কলার ইনফর্মার’ বা তথ্যদাতা। এদের মধ্যে কিছু পেশাজীবী, ব্যবসায়ী এবং রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী রয়েছেন। ডেভিড ইমনের মতো উঠতি সন্ত্রাসীরাও এই স্তরের অন্তর্ভুক্ত। তাদের কাজ হলো লক্ষ্যবস্তুর নিখুঁত তথ্য সংগ্রহ করে বিদেশে থাকা মাস্টারমাইন্ডদের কাছে পাঠানো।

তৃতীয় স্তরে থাকে ‘লোকাল হিট স্কোয়াড’, যারা মূলত স্থানীয় অপরাধী বা কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য। মাঝখানের দালালদের মাধ্যমে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকায় তাদের ভাড়া করা হয়। তাদের কাজ হলো নির্দেশ অনুযায়ী হামলা চালানো বা আতঙ্ক সৃষ্টি করা, যদিও তারা জানে না তাদের আসল নিয়োগকর্তা কে।