একসময় জ্ঞান অর্জনের প্রধান মাধ্যম ছিল বই। তবে বর্তমানে বইয়ের সামনে এক শক্তিশালী ও অদৃশ্য অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে, যাকে বলা হয় 'মনোযোগের অর্থনীতি'। বর্তমান বিশ্বে এমন এক শিল্প গড়ে উঠেছে, যেখানে খনিজ বা জ্বালানির বদলে মানুষের মনোযোগই প্রধান কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালে বৈশ্বিক বিজ্ঞাপন ব্যয় ১.১৪ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। এর মধ্যে গুগলের আয়ের প্রায় ৭৫ শতাংশ এবং মেটার ৯৮ শতাংশের বেশি এসেছে বিজ্ঞাপন থেকে। অর্থাৎ, বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসায়িক সাফল্য এখন সরাসরি নির্ভরশীল আমরা কতক্ষণ তাদের পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকি তার ওপর।
মানুষের মনোযোগ এখন আর কেবল মনোবিজ্ঞানের বিষয় নয়, বরং এটি বৈশ্বিক পুঁজিবাদের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদে পরিণত হয়েছে। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো ব্যবহারকারীকে যত বেশি সময় স্ক্রিনে ধরে রাখতে পারে, তাদের মুনাফা তত বৃদ্ধি পায়। এই প্রতিযোগিতার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে তরুণ প্রজন্মের পাঠাভ্যাসের ওপর।
বাংলাদেশে বই পড়ার প্রবণতা হ্রাস পাওয়ার বিষয়টি নতুন নয়। তবে একে কেবল 'মোবাইলের নেশা' বলে অভিহিত করলে প্রকৃত কারণ সামনে আসে না। প্রশ্ন জাগে, তরুণেরা কি স্বেচ্ছায় বই পড়া ছেড়ে দিচ্ছে, নাকি এমন এক ডিজিটাল পরিবেশ তৈরি হয়েছে যেখানে বইয়ের পক্ষে টিকে থাকা অসম্ভব?
বর্তমান প্রজন্মের তরুণরা প্রতিদিন অসংখ্য নোটিফিকেশন, রিল, শর্ট ভিডিও এবং অ্যালগরিদম-চালিত কনটেন্টের সম্মুখীন হয়। কয়েক সেকেন্ড পরপর নতুন উদ্দীপনা পাওয়ার এই সংস্কৃতি মস্তিষ্ককে দীর্ঘ সময় মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। একটি উপন্যাস বা গবেষণামূলক বই যেখানে দীর্ঘ সময়ের একাগ্রতা দাবি করে, সেখানে ৩০ সেকেন্ডের ভিডিও তাৎক্ষণিক আনন্দের প্রতিশ্রুতি দেয়। ফলে পাঠাভ্যাস এখন আর কেবল ব্যক্তিগত অভ্যাসের বিষয় নয়, বরং এটি একটি অসম অর্থনৈতিক লড়াইয়ের অংশ।
লেখক মাহ্ফুজ সরকার মনে করেন, "বই পড়া কমে যাওয়া কেবল একটি সাংস্কৃতিক পরিবর্তন নয়; এটি একটি জ্ঞানগত সংকট। যে সমাজ দীর্ঘ সময় মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না, সে সমাজ গভীরভাবে চিন্তা করতেও পারে না। আর যে সমাজ গভীরভাবে চিন্তা করতে পারে না, তার পক্ষে জ্ঞান, গবেষণা ও উদ্ভাবনে এগিয়ে যাওয়াও কঠিন। তাই পাঠাভ্যাস ফিরিয়ে আনার লড়াই আসলে শুধু বইয়ের জন্য নয়; এটি ভবিষ্যতের চিন্তাশীল নাগরিক গড়ে তোলার লড়াই।"
ইউনেসকোর গ্লোবাল এডুকেশন মনিটরিং রিপোর্ট এবং বিভিন্ন শিক্ষা গবেষণায় দেখা গেছে, শ্রেণিকক্ষে স্মার্টফোনের ব্যবহার সীমিত করলে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ও শিক্ষাগত অর্জনে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। নেদারল্যান্ডস, ফ্রান্স ও কানাডার বিভিন্ন অঞ্চলে স্কুলে মুঠোফোন নিষিদ্ধ করার পর শ্রেণিকক্ষের শৃঙ্খলা এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কের উন্নতি লক্ষ্য করা গেছে। যুক্তরাজ্যও কিশোর-কিশোরীদের রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নিয়েছে, কারণ পর্যাপ্ত ঘুম শেখার সক্ষমতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের এই পদক্ষেপগুলো প্রমাণ করে যে, এটি কেবল প্রযুক্তির নয়, বরং মনোযোগ রক্ষার লড়াই। অস্ট্রেলিয়া ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রবেশ সীমিত করার আইন করেছে এবং চীন অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ‘অ্যান্টি-অ্যাডিকশন’ ব্যবস্থা চালু করেছে। ইউরোপের অনেক দেশ স্কুলে ব্যক্তিগত ফোন ব্যবহারে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে, কারণ তারা বুঝেছে মনোযোগ হারালে শিক্ষা, মানসিক স্বাস্থ্য ও সামাজিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পরিস্থিতি আরও জটিল। ডিজিটাল আসক্তির পাশাপাশি পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা পাঠাভ্যাসের পথে বড় বাধা। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের বই ভালোবাসতে শেখানোর পরিবর্তে পরীক্ষায় নম্বর পাওয়ার জন্য মুখস্থ করায় উৎসাহিত করে। ফলে পাঠ্যবইয়ের বাইরের বই পড়া শিক্ষার্থীদের কাছে অপ্রাসঙ্গিক মনে হয় এবং পরীক্ষা শেষ হলেই বইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক শেষ হয়ে যায়। জ্ঞান অর্জনের আনন্দের চেয়ে শিক্ষা এখানে প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে।
নৃবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে দেখলে, ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী পিয়ের বুর্দিয়ো শিক্ষা ও পাঠকে 'সাংস্কৃতিক পুঁজি' হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। পরিবারে বই পড়ার পরিবেশ ও সাহিত্যচর্চা শিশুর মানসিক জগৎ গঠন করে। কিন্তু বর্তমানে অনেক পরিবারে বইয়ের তাকের জায়গা দখল করেছে স্মার্টফোন। শিশুরা এমন পরিবেশে বড় হচ্ছে যেখানে অবসরের অর্থ বই পড়া নয়, বরং স্ক্রল করা। ফলে পাঠাভ্যাস এখন সামাজিক পরিবেশের প্রতিফলন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অ্যালগরিদমের মাধ্যমে মানুষের মনোযোগ ধরে রাখে। প্রতিটি নোটিফিকেশন ও রিকমেন্ডেশন এমনভাবে নকশা করা হয় যাতে ব্যবহারকারী দীর্ঘক্ষণ অনলাইনে থাকে। অর্থাৎ, পাঠকের প্রতিপক্ষ কেবল একটি ফোন নয়, বরং শত শত বিলিয়ন ডলারের এক বৈশ্বিক শিল্প। নেটফ্লিক্সের 'দ্য সোশ্যাল ডিলেমা' (২০২০) প্রামাণ্যচিত্রে গুগল, ফেসবুক ও টুইটারের সাবেক কর্মকর্তারা দেখিয়েছেন যে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম এমনভাবে তৈরি যাতে ব্যবহারকারীর স্ক্রিন টাইম বাড়লে কোম্পানির মুনাফাও বাড়ে। এখানে মূল পণ্য মানুষের তথ্য নয়, বরং তার মনোযোগ।
তবে সমাধান প্রযুক্তির বিরোধিতায় নয়, বরং বই ও প্রযুক্তির সহাবস্থানে। স্কুলে মুঠোফোন ব্যবহারের স্পষ্ট নীতিমালা, পরিবারে 'স্ক্রিন-ফ্রি' সময় নির্ধারণ, পাঠাগার ও পাঠচক্রের বিস্তার এবং পরীক্ষাভিত্তিক শিক্ষার বদলে অনুসন্ধানী শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের 'ডিজিটাল সাক্ষরতা' শেখাতে হবে, যাতে তারা প্রযুক্তির ব্যবহারকারী হয়, প্রযুক্তির দ্বারা ব্যবহৃত না হয়।
পরিশেষে, বই পড়ার হার কমে যাওয়া একটি গভীর জ্ঞানগত সংকট। যে সমাজ গভীরভাবে চিন্তা করতে পারে না, তাদের জন্য উদ্ভাবন ও গবেষণায় এগিয়ে যাওয়া কঠিন। তাই পাঠাভ্যাস ফিরিয়ে আনা মানেই ভবিষ্যতের চিন্তাশীল নাগরিক গড়ে তোলার লড়াই।