আজ ২৯ জুলাই, বিশ্ব বাঘ দিবস। বাংলাদেশে এবারের দিবসের প্রতিপাদ্য ‘সবাই হই সচেতন, বাঘ করি সংরক্ষণ’। বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মুখে থাকলেও সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। সর্বশেষ শুমারি অনুযায়ী, এখানে ১২৫টি বাঘের বিচরণ রয়েছে, যা পূর্ববর্তী গণনার চেয়ে ১১টি বেশি।

জাতীয় পশু হিসেবে বাঘের গুরুত্ব অপরিসীম। ক্রীড়াঙ্গনে ‘টাইগার’ শব্দের ব্যাপক ব্যবহার এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের লোগোতে বাঘের উপস্থিতি এর মর্যাদারই বহিঃপ্রকাশ। তবে এই গৌরবের পাশাপাশি সুন্দরবনে বাঘের অস্তিত্ব নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে।

মুক্তকণ্ঠের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বাঘের সংখ্যা বাড়লেও নিরাপদ আবাসস্থল, পর্যাপ্ত খাদ্য এবং কার্যকর সুরক্ষার অভাব রয়ে গেছে। শিকারি সিন্ডিকেটের তৎপরতা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, লবণাক্ততার বিস্তার এবং বন ব্যবস্থাপনার ঘাটতি রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের অস্তিত্বকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থা (আইইউসিএন) এখনও সুন্দরবনের বাঘকে ‘ক্রিটিক্যালি এন্ডেঞ্জার্ড’ বা চরম ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে তালিকাভুক্ত রেখেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল সংখ্যা বৃদ্ধি নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে আবাসস্থল ও খাদ্যশৃঙ্খল নিশ্চিত করাই হবে প্রকৃত সাফল্য।

বাঘ গণনার পদ্ধতিতে এসেছে পরিবর্তন। ২০২৩-২৪ সালের সর্বশেষ শুমারিতে ১২৫টি পূর্ণবয়স্ক বাঘ শনাক্ত হয়েছে, যা ২০১৮ সালের তুলনায় ৯ দশমিক ৬৫ শতাংশ এবং ২০১৫ সালের তুলনায় ১৭ দশমিক ৯২ শতাংশ বেশি। বর্তমানে প্রতি ১০০ বর্গকিলোমিটারে বাঘের ঘনত্ব ২ দশমিক ৬৪টি। একই জরিপে ২১টি বাঘ শাবকের ছবি পাওয়া গেলেও বৈজ্ঞানিক মানদণ্ডে তাদের মূল গণনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, কারণ পূর্ণবয়স্ক হওয়ার আগে শাবকদের মৃত্যুঝুঁকি বেশি থাকে।

আগে কাদামাটির পায়ের ছাপ বা পাগমার্ক দেখে বাঘ গণনা করা হতো, যা নিয়ে বিতর্ক ছিল। এখন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ক্যামেরা ট্র্যাপিং প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে। খুলনার বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ জানান, ২০১৪ সাল থেকে সুন্দরবনের চারটি রেঞ্জকে প্রায় সাড়ে ছয়শ গ্রিডে ভাগ করে ২০০টির বেশি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। ১০ লাখ ছবি বিশ্লেষণের পর প্রতিটি বাঘের শরীরের স্বতন্ত্র ডোরাকাটা নকশা শনাক্ত করে তাদের গণনা করা হয়েছে। তিনি বলেন, “মানুষের আঙুলের ছাপ যেমন ভিন্ন, তেমনি প্রতিটি বাঘের শরীরের ডোরার নকশাও আলাদা। সেই বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতেই ১২৫টি পূর্ণবয়স্ক বাঘ শনাক্ত করা হয়েছে। ক্যামেরায় ১৯টি শাবকের উপস্থিতি মিললেও বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড অনুযায়ী সেগুলো মূল গণনায় ধরা হয়নি। কারণ বনের প্রতিকূল পরিবেশে অনেক শাবক পূর্ণবয়স্ক হওয়ার আগেই মারা যায়।”

বাঘ সংরক্ষণে বন বিভাগ এখন ড্রোন নজরদারি, ফুট পেট্রোলিং এবং তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক মনিটরিংয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে। ২৫টি অপরাধপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করে সেখানে বিশেষ নজরদারি চালানো হচ্ছে। এছাড়া স্বস্তির খবর এই যে, বাঘের জন্য প্রাণঘাতী ক্যানাইন ডিস্টেম্পার ভাইরাসের উপস্থিতি সুন্দরবনের বাঘের মধ্যে পাওয়া যায়নি।

মানুষ-বাঘ সংঘাতের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। ২০১৮ সালের পর থেকে বাঘ পিটিয়ে হত্যার কোনো দাপ্তরিক তথ্য নেই। সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এ জেড এম হাছানুজ্জামান এবং খুলনার বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “সুন্দরবনসংলগ্ন ৭৪ কিলোমিটার এলাকায় নাইলনের রোপ ফেন্সিং, ভিলেজ টাইগার রেসপন্স টিম, কমিউনিটি পেট্রোল এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রমের কারণে মানুষ-বাঘ সংঘাত উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।” তবে স্থানীয় ও গবেষকদের মতে, নদী-খাল ভরাট হওয়ার কারণে বাঘ লোকালয়ে প্রবেশ করছে, তাই নদী-খালের পুনঃখনন জরুরি।

খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি এখনও উদ্বেগের। বাঘের প্রধান খাদ্য চিত্রা হরিণ ও বুনো শুকর। নিয়মিত অভিযানে উদ্ধার হচ্ছে হাজার হাজার মিটার নাইলনের ফাঁদ ও হরিণের মাংস। কয়রা, শ্যামনগর, মংলা ও শরণখোলাকেন্দ্রিক প্রভাবশালী শিকারি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় হরিণের সংখ্যা কমছে, যা বাঘের জন্য হুমকি। সম্প্রতি একটি আহত বাঘিনীকে চিকিৎসা দিয়ে বনে অবমুক্ত করা হলেও ৪০টি ক্যামেরায় তার কোনো সন্ধান মেলেনি, যা অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

জলবায়ু পরিবর্তনকে সবচেয়ে বড় দীর্ঘমেয়াদি হুমকি হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও লবণাক্ততার কারণে বাঘ ও হরিণের শাবক নিরাপদ আশ্রয় হারাচ্ছে এবং মিঠাপানির উৎস সংকুচিত হচ্ছে। বন বিভাগ ২০টি কৃত্রিম কিল্লা ও ২০টি মিঠাপানির পুকুর তৈরি করলেও গবেষকদের মতে, ছয় হাজার বর্গকিলোমিটার বনের জন্য এটি অত্যন্ত সীমিত।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. মো. ওয়াসিউল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধি ইতিবাচক হলেও এটিকে স্থায়ী সাফল্য বলা যাবে না। কারণ জলবায়ু পরিবর্তন ও চোরাশিকার–এই দুই সংকট এখনও সমানভাবে বিদ্যমান। খাদ্যশৃঙ্খল দুর্বল হলে ভবিষ্যতে এই সংখ্যা ধরে রাখা কঠিন হবে।”

সুন্দরবন একাডেমির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির বলেন, “শুধু মোট বাঘের সংখ্যা জানালেই হবে না; বাঘ ও বাঘিনীর অনুপাতও প্রকাশ করা প্রয়োজন। কারণ দীর্ঘমেয়াদি প্রজনন ও জনসংখ্যার স্থিতিশীলতা অনেকটাই নির্ভর করে এই ভারসাম্যের ওপর। একই সঙ্গে কৃত্রিম কিল্লা ও মিঠাপানির পুকুর বাস্তবে কতটা কার্যকর, সেটিও বৈজ্ঞানিকভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে এই পরিসংখ্যান কেবল ‘কাগজের সাফল্য’ হয়ে থাকবে।