সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে প্রায়ই দেখা যাচ্ছে আমাদের শিশু-কিশোরেরা পড়াশোনায় আগ্রহ হারাচ্ছে এবং ডিজিটাল স্ক্রিনের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ছে। এমনকি একটি অংশ কিশোর গ্যাংয়ের সাথে জড়িয়ে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হচ্ছে। এই পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক হলেও এর উত্তরণে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ বা শিশুদের সুন্দর আগামীর জন্য সহায়ক কোনো প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তেমন দেখা যায়নি। বরং আনন্দময় শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করার পরিবর্তে শিশুদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে প্রাণহীন বইয়ের বোঝা এবং খেলাধুলার মাঠ কেড়ে নিয়ে তাদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে মোবাইল, ট্যাব ও ল্যাপটপ।
এমন বাস্তবতায় 'নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস'-এর মতো উদ্যোগ আশার আলো দেখিয়েছে। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে তৃণমূল পর্যায়ের ১২-১৪ বছর বয়সীদের নিয়ে গত ২ মে এই প্রতিযোগিতার সূচনা হয়। এতে দেশের সব উপজেলার ১ লাখ ৭০ হাজার খুদে খেলোয়াড় অংশগ্রহণ করেছে। ফুটবল, ক্রিকেট, কাবাডি, অ্যাথলেটিকস, ব্যাডমিন্টন, দাবা, সাঁতার ও মার্শাল আর্ট—এই আটটি ডিসিপ্লিনে ছেলেদের পাশাপাশি প্রায় ৫০ হাজার মেয়ে প্রতিযোগী অংশ নিয়েছে। বাংলাদেশের মতো রক্ষণশীল সমাজে জাতীয় পর্যায়ের একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় এত বিপুলসংখ্যক মেয়ের অংশগ্রহণ একটি বড় অর্জন।
সরকারের ভাষ্যমতে, দেশজুড়ে ক্রীড়া প্রতিভার বিকাশ এবং খেলাধুলাকে অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যেই নতুন কুঁড়ির এই আয়োজন। এত বিশালসংখ্যক খুদে খেলোয়াড়কে অন্তর্ভুক্ত করে এমন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা নিঃসন্দেহে চ্যালেঞ্জিং ছিল। তবে শিশু-কিশোরদের মধ্যে যে আগ্রহ ও উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে, তাতে এটি কেবল প্রতিযোগিতার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না থেকে একটি উৎসবের রূপ নিয়েছে।
এর আগে প্রাথমিক বিদ্যালয় গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের ক্ষেত্রেও শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ও আগ্রহ দেখা গিয়েছিল। এই উদাহরণ থেকে স্পষ্ট যে, রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করা হলে শিশুদের খেলাধুলা ও সহশিক্ষা কার্যক্রমে আগ্রহী করে তোলা সম্ভব। নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসে কে চ্যাম্পিয়ন হলো তা কৃতিত্বের বিষয় হলেও, তার চেয়ে বড় সাফল্য হলো সারা দেশের বিপুল সংখ্যক শিশু-কিশোরের মধ্যে খেলাধুলা নিয়ে আগ্রহ তৈরি করা।
গত সোমবার বাংলাদেশ আর্মি স্টেডিয়ামে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার বক্তব্যে বলেছেন, "আজকের শিশুরা যদি নিজেদের সঠিকভাবে গড়ে তুলতে পারে, তবেই ভবিষ্যতের একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব। তবে এর জন্য একটি সমন্বিত পরিকল্পনা ও সেটা বাস্তবায়নে নিরলস প্রচেষ্টা প্রয়োজন।"
বর্তমান সরকারের আমলে এটি প্রথম আয়োজন। আশা করা যায়, এবারের সীমাবদ্ধতাগুলো কাটিয়ে আগামীবার আরও সুসংগঠিতভাবে এই আয়োজন করা হবে। তবে মনে রাখতে হবে, কেবল প্রতিযোগিতা আয়োজন করাই শেষ কথা নয়; সবার আগে প্রয়োজন শিশু-কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ নিশ্চিত করা। প্রতিযোগিতার মাধ্যমে যেসব ক্রীড়া প্রতিভা উঠে আসছে, তাদের জন্য প্রশিক্ষণ, বৃত্তিসহ আনুষঙ্গিক সহায়তা ও পৃষ্ঠপোষকতা অব্যাহত রাখতে হবে। একটি ক্রীড়া সহায়ক পরিবেশ ও অবকাঠামো গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই।