সম্প্রতি ভারতে মানবাধিকারকর্মী যশবন্ত সিং খালরার সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত ‘সাতলুজ’ নামের একটি সিনেমাকে নিষিদ্ধ করেছে সরকার। প্রশ্ন হচ্ছে, আশি ও নব্বইয়ের দশকে পাঞ্জাবে সংঘটিত রাষ্ট্রীয় সহিংসতা নিয়ে নির্মিত এই সিনেমাটি মানুষকে দেখাতে এতটা বাধা আসবে কেন?
যুক্তি খুঁজলে মনে হতে পারে, তাদের তো উল্টো আনন্দ পাওয়ার কথা। দেখা যায়, কংগ্রেস আমলে রাষ্ট্রের ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ টেনে এনে আজকের বিজেপি রাজনীতিতে ‘সমালোচনার’ একটা ধারাবাহিক ধারা তৈরি হয়েছে—গান্ধী বা নেহরুদের মধ্যে সীমিত নয়, বরং গান্ধী পরিবারের রাজনীতিকে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করা এবং উত্তর-ঔপনিবেশিক ভারতের নানা ঐতিহাসিক সমস্যার পেছনে কংগ্রেসকে দায়ী করার প্রবণতাও এর অংশ। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, ‘সাতলুজ’কে সহজ পথে মুক্তি দিতে দেওয়া হয়নি। দীর্ঘ তিন থেকে চার বছরের সেন্সর-নিপীড়নের পর ওটিটিতে ‘গেরিলা–মুক্তি’ ঘটলেও মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সেটাও বন্ধ করে দেওয়া হয়। ঠিক এই ‘বিকল্পহীন’ সময়সূচির ভেতরেই প্রশ্নচিহ্ন জমে থাকে। আর সেই প্রশ্নচিহ্নের ভেতরেই লুকিয়ে আছে সম্ভাব্য নানা ব্যাখ্যা—যেগুলো দেখার জন্য জনমনে কৌতূহল তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
দীর্ঘদিন ধরেই ভারতীয় সিনেমায় সহিংসতা ও সন্ত্রাসবাদের গল্প বলা যেন অনেকটা সহজাত রীতি হয়ে উঠেছে। ‘দ্য কাশ্মীর ফাইলস’ (২০২২), ‘দ্য কেরালা স্টোরি’ (২০২৩), ‘আর্টিকেল ৩৭০’ (২০২৪), ‘দ্য সবরমতী রিপোর্ট’ (২০২৪), ‘দ্য বেঙ্গল ফাইলস’ (২০২৫) কিংবা ‘ধুরন্ধর’–এর (২০২৫) মতো শিরোনামগুলোতে ইতিহাসের ছায়া, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সহিংসতা এবং হিন্দু জাতীয়তাবাদের বয়ান মিশিয়ে রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডানির্ভর ছবি নির্মাণের ধারা দৃশ্যমান। এসব ছবি আজ ভারতীয় মূলধারার সবচেয়ে ব্যবসাসফল ঘরানাগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে।
এই ধারার মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই একটি প্রশ্ন উঠে আসে—কার সহিংসতা বা ‘সন্ত্রাসবাদ’ সিনেমায় নির্বিঘ্নে দেখানো যায়, আর কারটা দেখানো যায় না? ভারতের ভেতরের বা বাইরের মুসলমানদের সন্ত্রাসবাদ—ইতিহাস যতই বিকৃত হোক বা উদ্দেশ্যমূলকভাবে বানানো হোক—সাধারণত কোনো বড় কাটছাঁট ছাড়াই সেন্সর অনুমোদন পেয়ে যায়। সেন্সর বোর্ডের মূল্যায়নে সবসময়ই সেই সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলো সামনে আসে না, যেগুলো ধারাবাহিকভাবে কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে ‘সন্ত্রাস’ বা ‘জাতীয় শত্রু’ হিসেবে স্বাভাবিকভাবে উপস্থাপন করার মাধ্যমে সৃষ্টি হতে পারে; অর্থাৎ ওই সম্প্রদায়ের নিরাপত্তাজুঁকি ও ‘সেন্স অব বিলংগিং’ কতটা গভীরভাবে বিপন্ন হতে পারে—সেটি কতটা আমলে নেওয়া হয়, তা নিয়েই প্রশ্ন থেকে যায়।
উল্টো দিকে, এমন ছবিগুলো অনেক সময় ক্ষমতাসীন দলের প্রত্যক্ষ মদদে নির্মিত, সুবিধাপ্রাপ্ত এবং প্রচারিত হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। মোদি স্বয়ং প্রকাশ্যে এসব ছবির প্রশংসা করেন এবং এগুলোকে জাতীয়তাবাদী ‘সত্যকথন’ হিসেবে তুলে ধরার চর্চাও দেখা যায়।
‘সাতলুজ’কে এখানে অন্যভাবে দেখা হয়। বলা হচ্ছে, এটি কোনো প্রোপাগান্ডা ছবি নয়—যশবন্ত সিং খালরার জীবনকাহিনিভিত্তিক আর্কাইভধর্মী গল্প। শ্মশান থেকে শ্মশান ঘুরে ও নথি খুঁড়ে যশবন্ত সিং খালরা উন্মোচন করেছিলেন বলে যে বিবরণ উঠে আসে, তাতে বলা হয়—কীভাবে রাষ্ট্র তার পুলিশ বাহিনীর মাধ্যমে ‘সন্ত্রাসী’ আর ‘সাধারণ নির্দোষ মানুষ’–এর ভেদরেখা ইচ্ছাকৃতভাবে ঝাপসা করে দিয়ে প্রায় ২৫ হাজার শিখকে গুম করে হত্যা করেছে। হাজারো লাশের নাম, পরিচয়, উপস্থিতি গায়েব করে দিতে শ্মশানে পোড়ানো হয়েছে—এমন দাবিও এই গল্পে স্থান পায়।
নিরীহ মানুষদের সন্ত্রাস নির্মূলের নামে নির্বিচার গুম-খুন ও গায়েব করে দেওয়ার বিরুদ্ধে মানবাধিকার আন্দোলন শুরুর কথা বলা হয়। সেই সঙ্গে অভিযোগ করা হয়—পুলিশ শেষ পর্যন্ত যশবন্ত সিং খালরাকেও গুম করে, পুলিশি হেফাজতে নির্মমভাবে হত্যা করে। একজন সাধারণ মানুষ কীভাবে রাষ্ট্রের গণগুম ও গণহত্যার কালো ছায়ার বিরুদ্ধে একাই প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন—সেই গল্পকেই এই ছবির মুখ্য কাহিনি হিসেবে তুলে ধরা হয়।
বলিউড-বাণে কতটা রক্তাক্ত ‘উদার ভারত’
‘সাতলুজ’ শুধু নিষিদ্ধ হওয়া একটি সিনেমা নয়। এটি একদিকে যেমন সমসাময়িক ভারতের ইতিহাস ও স্মৃতি নির্মাণের রাজনীতি এবং হিন্দুত্ববাদী সাংস্কৃতিক শাসনের প্রকৃতি বোঝার এক গুরুত্বপূর্ণ কেস স্টাডি। অন্যদিকে এই ছবি আমাদের বুঝতে শেখায়, ভারত কীভাবে ধীরে ধীরে একটি ‘উত্তর-ঔপনিবেশিক নিরাপত্তা-রাষ্ট্রে’ পরিণত হয়েছে।
নতুন প্রজন্ম, আর ভারতের ও বিশ্বের অনেক মানুষ এই পাঞ্জাবের সেই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদের ইতিহাস জানে না; আবার প্রতিরোধের গল্পও মূলত অজানাই থেকে যায়। ফলে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদের সেই মুছে ফেলা নথিগুলোকে ‘সাতলুজ’ আবার পর্দায় দলিল হিসেবে হাজির করে—এমন ব্যাখ্যার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। ছবির প্রতিটি রিল হয়ে ওঠে একেকটা সাক্ষ্য—‘২৫ হাজার ১টি’ লাশের সাক্ষ্য।
আরেকটি প্রবণতা হিসেবে বলা হয়—ভারতের বর্তমান হিন্দুত্ববাদী সাংস্কৃতিক শাসনে বারবার রাষ্ট্র, পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীকে নায়ক হিসেবে হাজির করা হয়। ফলে তাদের সহিংসতা ‘স্পাই/মিলিটারি থ্রিলার’ এবং ‘পুলিশ/কপ থ্রিলার’–এর ভেতর দিয়ে ‘সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান’, ‘অপারেশন’ এবং ‘নিরাপত্তাব্যবস্থা’ নামে ভাষান্তরিত ও সাধারণীকরণ হয়ে ওঠে। এ ধারাকে প্রশ্নের মুখে আনতে ‘সাতলুজ’ এমন আখ্যান ভাঙে বলে দাবি করা হয়—রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত সহিংসতার ভুক্তভোগী হিসেবে শিখদের এবং খালিস্তানি বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের সামনে আনা হয়; আর বিপরীতে রাষ্ট্র, পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীকে অপরাধী হিসেবে হাজির করা হয়। এতে রাষ্ট্র ও তার নিরাপত্তাযন্ত্রের নায়কোচিত চেহারা ভেঙে পড়ে—এমন যুক্তিও সামনে আনা হয়। তাই ‘সাতলুজ’–কে ‘জাতীয় নিরাপত্তা’ এবং ‘ভারতের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার বিরুদ্ধে’ একধরনের (অপ)প্রচেষ্টা হিসেবে চিহ্নিত করার প্রসঙ্গও আলোচনায় আসে।
এই ছবিতে এমন ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে বলে বলা হয়, যা সরকারি নিরাপত্তা কার্যক্রমকে নিরপেক্ষ ও স্বাভাবিক ও দরকারি প্রশাসনিক ব্যবস্থা হিসেবে দেখার প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে। পাশাপাশি অব্যাহত রাষ্ট্রীয় সহিংসতার ধারাবাহিকতাকে প্রকাশ্যে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়—এমন বক্তব্যও আছে।
সেই সঙ্গে বলা হচ্ছে, পাঞ্জাবে সে সময় কী হয়েছিল—রাষ্ট্রীয় সহিংসতার ইতিহাস কেবল দলীয় রাজনীতির প্রশ্ন নয়। রাষ্ট্রের নিরাপত্তাকাঠামো (যেমন পুলিশ, মিলিটারি, গোয়েন্দা সংস্থা) ব্যবহার করে যেকোনো বিদ্রোহকে ‘সন্ত্রাস’ বা ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ ট্যাগ দিয়ে অবদমিত করার ক্ষেত্রে সব সরকারই প্রায় একইভাবে কাজ করে—এমন পর্যবেক্ষণও করা হয়।
‘সাতলুজ’ দেখে কারও মনে হতে পারে—রাষ্ট্র একই কায়দায় নানান স্বাধীনতাকামী বা সংখ্যালঘু গোষ্ঠীকে অবদমন করছে। এই ২৫ হাজার লাশের শোকস্মৃতি এবং যশবন্ত সিং খালরার প্রতিরোধী চরিত্র দর্শকদের চোখে বর্তমান ভারতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের নানা সাধারণীকরণ, অসাড় হয়ে থাকা দিকগুলোকেও স্পষ্ট করে তুলতে পারে এবং তাদের নতুন করে প্রশ্ন করতে ও প্রতিবাদী হয়ে উঠতে উসকে দিতে পারে—এমন সম্ভাবনার কথাও বলা হয়।
একদর্শী ভারতের বিজ্ঞাপন ‘দ্য কাশ্মীর ফাইলস’
কাশ্মীর ফাইলস থেকে আরআরআর: ভারতীয় সিনেমা ‘সাবালক’ হবে কবে।
রাষ্ট্র কোন স্মৃতিকে নিরাপদ আর কোন স্মৃতিকে বিপজ্জনক মনে করে—এটা বোঝা কঠিন নয় বলে মত পাওয়া যায়। অভিযোগ করা হয়, ‘কাশ্মীর ফাইলস’ বা ‘বেঙ্গল ফাইলস’–এর মতো সিনেমা ‘ইতিহাস-কথন’ বলে নির্ভয়ে চলতে থাকলেও ‘সাতলুজ’–এর মতো রাষ্ট্রীয় সহিংসতার ইতিহাস সামনে আনা ছবি নিষিদ্ধ হয়ে যায়। এছাড়া ছবির পরিচালক হানি ত্রেহানকে সেন্সর বোর্ড ছাড়পত্র প্রদানের শর্ত হিসেবে বলে উল্লেখ করা হয়—ছবিতে দেখানো লাশের সংখ্যা ২৫ হাজার থেকে কমিয়ে ৪ থেকে ৫ হাজার করতে হবে।
এই প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে বলা হয়, সরকারি সেন্সর ঠিক করে দিচ্ছে—কোন ইতিহাস অনুমোদিত, আর কোনটা নয়; কোন সহিংসতা ‘ধুরন্ধর’ ছবির মতো চিৎকার প্রচার করা যাবে, আর কোন সহিংসতা নীরবে মুছে ফেলতে হবে। ফলে ‘সাতলুজ’ নাকি দেখিয়ে দেয়—রাষ্ট্র শুধু জীবনের ওপরই নয়, স্মৃতি, শোক, মৃত্যুর ওপরও শাসন করে।
নাজমুল আরেফিন
কানাডার ইউনিভার্সিটি অব আলবার্টার সহকারী লেকচারার।
মতামত লেখকের নিজস্ব