রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে দফায় দফায় মারধর ও হামলার ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়টির কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ সাংবাদিকদের সতর্ক করে বলেছেন, ‘এত মায়া কান্না করা যাবে না। আপনারা সাংবাদিকেরা যেসব শব্দ ব্যবহার করেন, এগুলোর বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা নেব। আপনারা কালকে ছাত্রলীগকে ডিফেন্স করে (পক্ষ হয়ে) অনেকে নিউজ করেছেন। এই সাংবাদিক এখানেও অনেকে আছে। আমরা সেগুলো জড়ো করে করে এখানে ব্যবস্থা নেব।’
মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় রাকসু ভিপির কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মোস্তাকুর রহমান এসব কথা বলেন। সোমবার বিকেলে সাবেক ছাত্রলীগ কর্মীসহ কয়েকজন শিক্ষার্থীর দ্বারা রাকসু কার্যালয়ে হামলার ঘটনায় এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের শব্দ প্রয়োগের বিষয়ে হুঁশিয়ারি দিয়ে রাকসু ভিপি বলেন, ‘আপনারা বলেছেন, আমরা হামলা করেছি। এটা কোন ধরনের কথা? তারা হামলা করেছে, আমরা প্রতিরোধ করেছি। আপনারা এই শব্দ বলতে এত কাঁপাকাঁপি করেন কেন? আর আপনারা এত মায়া কান্না দেখান কেন ছাত্রলীগের প্রতি?’
এই সম্মেলনে রাকসুর পক্ষ থেকে ছয় দফা দাবি উত্থাপন করা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—নারী শিক্ষার্থীকে প্রাণনাশের হুমকির ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, রাকসু ভবনে হামলা ও শিক্ষার্থীদের ওপর হামলায় জড়িতদের গ্রেপ্তার ও বিচার, দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ তদন্ত, ক্যাম্পাসে সন্ত্রাস ও রাজনৈতিক পরিচয়ের অপব্যবহার বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অতীতে নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত ও ছাত্রলীগ-সংশ্লিষ্টদের বিচার নিশ্চিত করা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে হামলার ঘটনায় শিক্ষার্থীদের চেয়ে সাংবাদিকদের উদ্বেগ বেশি বলে উল্লেখ করে রাকসু ভিপি বলেন, ‘আপনারা বলছেন, লাইব্রেরিতে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীদের আমরা বের করে এনেছি, এতে ২০-২৫ মিনিট তাদের পড়াশোনা নষ্ট হয়েছে। কিন্তু কোনো শিক্ষার্থী তো আমাদের বলেনি যে ভাই, আপনারা আমার ২০-২৫ মিনিট নষ্ট করে দিয়েছেন। আপনারা সাংবাদিকেরা বিষয়টিকে বেশি অতিরঞ্জিত করছেন। মনে হচ্ছে, তারা ২৪ ঘণ্টাই পড়াশোনা করে, আর ওই ২০-২৫ মিনিট নষ্ট হওয়াই সবচেয়ে বড় বিষয়।’
তিনি আরও জানান, লাইব্রেরির শিক্ষার্থীরা অভিযোগ না দিলেও ছাত্রদল লাইব্রেরির শিক্ষার্থী হিসেবে মানববন্ধন ডেকেছে। এর উদ্দেশ্য সম্পর্কে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, এর উত্তর ছাত্রদল দিতে পারবে। রাকসুর জিএস সালাউদ্দিন আম্মারের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, ‘রাকসু ভবনে হামলার ঘটনায় যতজন ছাত্রলীগ ছিল, তার চেয়ে বেশি ছাত্রদল ছিল। শিক্ষার্থীদের ওপর যেই হামলা করুক আমরা ব্যবস্থা নেব। প্রশাসন বিএনপিপন্থী বলে ছাত্রদলের বা শিবিরের বিচার হবে না এমন নয়।’
সংবাদ সম্মেলনে রাকসু জিএস সালাউদ্দিন আম্মার সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমি আপনাদের সাংবাদিকতা শেখাব না, এটা আমার থেকে ভালো আপনারা জানেন। কীভাবে শব্দ দিয়ে মানুষকে তৈরি করতে হয়, কীভাবে শব্দ দিয়ে মানুষকে ধ্বংস করতে হয়। আমার এই জায়গায় আপনাদের অবদান আছে। প্রত্যেকে জুলাইয়ের খুব সামনে থেকে কাজ করছেন। এটাকে প্রতিরোধ হিসেবে কেন নিতে পারেন না?’
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন রাকসুর এজিএস এস এম সালমান সাব্বির, মিডিয়া সম্পাদক মুজাহিদুল ইসলাম, মহিলাবিষয়ক সম্পাদক সৈয়দা হাফসা, সহ-মহিলাবিষয়ক সম্পাদক সামিয়া জাহান এবং তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক বি এম নাজমুস সাকিব।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত রোববার রাতে সংস্কৃত বিভাগের এক ছাত্রীর অভিযোগের প্রেক্ষিতে প্রক্টর দপ্তরে বৈঠক হয়। ওই ছাত্রী অভিযোগ করেছিলেন যে, একই বিভাগের শিক্ষার্থী মহসিন আলম প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর তাঁকে ভয়ভীতি দেখিয়ে ক্যাম্পাস ছাড়ার হুমকি দিয়েছেন। এ ঘটনায় অভিযুক্ত মহসিনের পক্ষে উপস্থিত আনাস, হাসিব ও মাহমুদুল হাসানের সঙ্গে প্রক্টরের বাগ্বিতণ্ডা হয়।
পরদিন সোমবার পুনরায় বৈঠকে আনাসকে নিষিদ্ধ ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের কর্মী দাবি করে মারধরের অভিযোগ ওঠে। পরিস্থিতি শান্ত হলে সবাই প্রক্টর দপ্তর ত্যাগ করেন। অভিযোগ রয়েছে, এর কিছুক্ষণ পর আনাস, হাসিব, মাহমুদুলসহ কয়েকজন রাকসু ভবনে গিয়ে সালাউদ্দিন আম্মার ও বি এম নাজমুস সাকিবের ওপর হামলা চালান, যাতে নাজমুস সাকিব আহত হন।
পরবর্তীতে আনাস, হাসিব ও মাহমুদুল কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পাঠকক্ষের সামনে অবস্থান করলে সেখানে রাকসু ও ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে তাঁদের বাগ্বিতণ্ডা ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে তাঁরা পাঠকক্ষের ভেতরে আশ্রয় নিলে রাকসু ও ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীরা ভেতরে ঢুকে তাঁদের দফায় দফায় মারধর করেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
মারধরের শিকার তিন শিক্ষার্থীর মধ্যে আনাস ও মাহমুদুল হাসানকে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ‘সন্ত্রাসী কার্যক্রম’–সংক্রান্ত একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এ ঘটনায় পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে, যাদের আগামী ১০ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।