নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের ফলে জামালপুর পৌর শহরের প্রায় কোটি টাকার সিসিটিভি নিরাপত্তাব্যবস্থা অচল হয়ে পড়েছে। ডিজিটাল নজরদারি ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার সুযোগ নিয়ে বর্তমানে শহরজুড়ে চোর চক্রের তৎপরতা বহুগুণ বেড়েছে।
৭৮ লাখ টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত এই প্রকল্প চালুর পরপরই দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। নিম্নমানের সরঞ্জাম ব্যবহারের কারণে স্থাপনের অল্প সময়ের মধ্যেই প্রায় সব ক্যামেরা অকার্যকর হয়ে পড়ে। স্থানীয়দের দাবি, গত এক মাসেই জামালপুর সদরের বিভিন্ন এলাকায় ২০-৩০টিরও বেশি চুরির ঘটনা ঘটেছে। তবে মামলা করার ঝামেলা এবং মালামাল ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা কম থাকায় অনেকেই থানায় যাননি।
জামালপুর পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত ১ জুন থেকে ৬ জুলাই পর্যন্ত সদরে চুরির ঘটনায় ১০টি মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং ২৫ জন আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, গত এক মাসে চুরির ঘটনায় সাধারণ মানুষের ৩০ লাখ টাকারও বেশি ক্ষতি হয়েছে।
সাম্প্রতিক কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনার মধ্যে ৩০ জুন রাতে আমলাপাড়া এলাকায় এক বিচারক দম্পতির ভাড়া বাসায় জানালার গ্রিল কেটে চুরির ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগী আহমাদুল কবির সাকিল ও তার স্ত্রী নুসরাত জেরিন জেনি দুজনেই সিভিল জজ আদালতের বিচারক। তাদের বাসা থেকে হিরের আংটি, প্রায় ৮ ভরি স্বর্ণালংকার এবং নগদ এক লাখ টাকাসহ ১৯ লাখ টাকারও বেশি মূল্যের সামগ্রী লুট করা হয়। এছাড়া ৫ জুলাই বাইপাস এলাকায় নগদ টাকা, ২ ভরি স্বর্ণালংকার, টিভি ও ল্যাপটপ চুরি হয় এবং ৮ মার্চ চামড়াগুদাম এলাকায় এক সাংবাদিকের বাসায় দিনের বেলা চুরি ঘটে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পৌরবাসীদের অভিযোগ, সিসি ক্যামেরাগুলো সচল থাকলে অপরাধীদের শনাক্ত করা সহজ হতো। নজরদারি না থাকায় চোর-ছিনতাইকারীদের সাহস বেড়েছে। শহরের বাসিন্দা সামি বলেন, "এলাকায় দিনের পর দিন চুরি হচ্ছে কিন্তু সিসি ক্যামেরার কোনো ফুটেজ পাওয়া যায় না। পুলিশকে বললে তারা বলে ক্যামেরা নষ্ট। জনগণের লাখ লাখ টাকা খরচ করে এই খেলনা ক্যামেরা কেন লাগানো হলো"।
তদন্তে জানা গেছে, ২০২১-২২ অর্থবছরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পৌরসভা এই প্রকল্প হাতে নেয়। ২০২২ সালের ২৭ জুলাই সাবেক মেয়র ছানোয়ার হোসেন ছানুর ঘনিষ্ঠ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স মামীম এন্টারপ্রাইজকে ৭৮ লাখ টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয়। পৌরসভার তথ্যমতে, মোট ১২৬টি ক্যামেরার মধ্যে ২২টি পৌর কার্যালয়ে এবং ১০৪টি শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে বসানো হয়েছিল। তবে বর্তমানে ১০০ শতাংশ ক্যামেরাই অকার্যকর; অনেকটি সংযোগ বিচ্ছিন্ন, ভেঙে ঝুলছে অথবা চুরি হয়ে গেছে।
সচেতন মহলের অভিযোগ, দরপত্রে প্রতিটি ক্যামেরার মূল্য ধরা হয়েছে ৩৫ হাজার ৬০০ টাকা, অথচ বাজারে একই মানের ক্যামেরা ৫-৬ হাজার টাকায় পাওয়া যায়। আনুষঙ্গিক পণ্য ও সার্ভার রুমের নামে ৩০-৪০ লাখ টাকা লোপাট করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়। শহরের বাসিন্দা মো. সম্রাট বলেন, "এই সিসি ক্যামেরা যদি চোর-সন্ত্রাসী ধরার জন্য ব্যবহার করা হতো, তাহলে ৩ ও ৪ তারিখে সাবেক মেয়রের যে অস্ত্রের মহড়া ছিল, তাও ক্যামেরায় ধরা পড়ত। এই ক্যামেরাগুলো সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছিল। এখন সব নষ্ট হয়ে পড়ে আছে"।
ক্যামেরা অচল থাকায় অপরাধী শনাক্তে বেগ পেতে হচ্ছে বলে স্বীকার করেছে পুলিশ। জামালপুর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম এন্ড অপস্) ইয়াহিয়া আল মামুন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "চুরিসহ অন্যান্য সম্পত্তি সংক্রান্ত অপরাধ রোধকল্পে জামালপুর জেলা পুলিশ সক্রিয় রয়েছে। পাশাপাশি জেলা পুলিশের টহল এবং চেকপোস্ট জোরদার করা হয়েছে। বিট পুলিশিং এর মাধ্যমে জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর কাজ চলমান রয়েছে।"
এই বিষয়ে জামালপুর পৌরসভার পৌর প্রশাসক মৌসুমী খানম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "আগে যে সিসি ক্যামেরাগুলো লাগানো ছিল, সেগুলোর বেশিরভাগই ৫ই আগস্টের পরের ভাঙচুরের সময় নষ্ট হয়ে গেছে। আর বাকিগুলোর ক্যামেরা খুলে রাখা হয়েছিল। তারগুলো সব চুরি হয়ে গেছে। এখন সিসি ক্যামেরা সবগুলোই ইনঅ্যাক্টিভ হয়ে আছে।"
তিনি আরও জানান, শহর ও শহরবাসীর নিরাপত্তার জন্য নতুন পরিকল্পনা করতে হবে, কারণ আগের ক্যামেরার কোনো অস্তিত্ব নেই। দুর্নীতির অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "তৎকালীন সময়ে সিসি ক্যামেরা কেনা বা লাগানোর ক্ষেত্রে বাড়তি দাম নেওয়ার যে অভিযোগ, সে ব্যাপারে আমি আসলে কিছু বলতে পারব না; কারণ ওটা তো আর আমার মেয়াদে হয়নি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ যদি মনে করে, তারা এটি তদন্ত করে দেখবেন।"