অর্থনীতিতে জনসাধারণের পণ্য (পাবলিক গুডস) সাধারণত দুটি মৌলিক বৈশিষ্ট্যের আলোকে ব্যাখ্যা করা হয়: অবর্জনযোগ্যতা (নন-এক্সক্লুডেবিলিটি) এবং অপ্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ভোগ (নন-রাইভ্যালরি)। অবর্জনযোগ্যতা বলতে বোঝায়—কোনো পাবলিক গুডস একবার সরবরাহ করা হলে, কেউ তার মূল্য পরিশোধ করুক বা না করুক, তাকে সেই সুবিধা ভোগ করা থেকে বিরত রাখা যায় না। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, নাগরিককে জাতীয় প্রতিরক্ষার সুরক্ষা বা বিশুদ্ধ বাতাসের মতো সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা যায় না।
অপ্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ভোগের অর্থ হলো—একজন ব্যক্তি কোনো পাবলিক গুডস ভোগ করলে অন্য কারও জন্য সেটির পরিমাণ বা গুণগত মান কমে যায় না। যেমন একজন যদি একটি আলোকিত পথবাতির নিচে হাঁটেন, এতে পরবর্তী ব্যক্তির জন্য আলো ম্লান হয়ে যায় না।
পাবলিক গুডসের এই বৈশিষ্ট্যগুলোর কারণেই ফাউ উপভোগের (ফ্রি-রাইডার) সমস্যা দেখা দেয়। সুবিধাভোগীদেরকে আলাদা করে নির্দিষ্ট অবদান দিতে বাধ্য করা সম্ভব হয় না। ফলে তারা স্বেচ্ছায় অর্থ প্রদান বা অংশগ্রহণের তাগিদ কম অনুভব করে এবং অন্যদের অবদানের ওপর ‘ফাউ উপভোগ’ করার সুযোগ তৈরি হয়। অর্থনীতির পাঠ্যপুস্তকে যে সংজ্ঞা আছে, সেটি জুলাই বিপ্লবের অর্জনের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করে দেখা যায়।
.জুলাই বিপ্লবে অংশগ্রহণ করে পরবর্তী সময়ে যারা অপরাধ করেছে, তাদের অবশ্যই আইনের আওতায় এনে বিচার করতে হবে এবং আইনের বিধান অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু ভিত্তিহীন অভিযোগ অবশ্যই বন্ধ হওয়া উচিত।.
জুলাই বিপ্লব কেবল একজন শাসককে ক্ষমতাচ্যুত করে আরেকজনকে ক্ষমতায় বসানোর ঘটনাই ছিল না। এর মধ্য দিয়ে কিছু বাস্তব ও দৃশ্যমান অর্জনও সামনে এসেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে ধরা যায়—১. মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ২. রাষ্ট্রশক্তির নির্মম ব্যবহারের ওপর নিয়ন্ত্রণ। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই দুটিই অবর্জনযোগ্য ও অপ্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ভোগের শর্ত পূরণ করে; অর্থাৎ এগুলো জনসাধারণের পণ্যের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।
অবর্জনযোগ্যতার দিকটি দৃশ্যমান। ক্ষমতাচ্যুত সরকারের সহযোগীরাও এখন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ভোগ করছেন, যা জুলাই ২০২৪-এর আগে ছিল না। আগের সময়ে ভিন্নমতাবলম্বীদের শিকার করত যে নির্মম নিরাপত্তাব্যবস্থা, সেই ভয়ের ছায়া কাটিয়ে তাঁরা এখন কথা বলতে পারছেন।
অপ্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ভোগের বিষয়টিও সমানভাবে স্পষ্ট। সম্প্রতি কার্টুনিস্ট মেহেদী হকের আঁকা একটি কার্টুনে জুলাই বিপ্লবের একজন শীর্ষ নেতাকে স্থূলকায় হিসেবে দেখানো হয়েছে। কার্টুনটিতে এমন ইঙ্গিত করা হয়েছে, তিনি বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে অসৎ উপায়ে লাভবান হয়েছেন। কার্টুনটি অবাধে ছড়িয়ে পড়েছে, যা আগের শাসনামলে কল্পনাও করা যেত না।
এক্ষেত্রে আগে ঘটে যাওয়া দমন-পীড়নের বাস্তবতাও মনে রাখা দরকার। কার্টুনিস্ট ও ব্যঙ্গচিত্রশিল্পীরা কঠোর আইন, ভয়ভীতি প্রদর্শন, শারীরিক আটকসহ নানা নির্যাতনের মুখোমুখি হয়েছেন—ভিন্নমত দমন এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করতেই এসব করা হয়েছে বলা হয়। কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোরকে ২০২০ সালের মে মাসে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অধীনে গ্রেপ্তার করা হয় এবং হেফাজতে নির্যাতনের শিকার হতে হয়। পরে ২০২১ সালের মার্চে তিনি জামিনে মুক্তি পান।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮ সালে পাস হয়। মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই আইনের ব্যাপক সমালোচনা করেছিল। তাদের বক্তব্য ছিল—বিস্তারিত ও অস্পষ্ট ধারাগুলোর কারণে কার্যত অনলাইন মতপ্রকাশকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার সুযোগ তৈরি হয়। তৎকালীন সরকার নীতিগতভাবে এই আইন ব্যবহার করে সমালোচনামূলক কার্টুন বা দুর্নীতিবিরোধী ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশকারী শিল্পী ও লেখকদের গ্রেপ্তার বা হয়রানি করত।
.গ্রেপ্তারের নিশ্চিত ভয়ের পরিবেশ কার্টুনিস্ট এবং মূলধারার সংবাদমাধ্যমকে কঠোর স্ব-সেন্সরশিপে ঠেলে দিয়েছিল। রাষ্ট্রের প্রতিশোধের আশঙ্কা এড়াতে অনেক সময় বড় বড় সংবাদপত্র নিজেদের প্রকাশিত কার্টুন বাদ দিত, অথবা সরকারপ্রধানদের সমালোচনামূলক ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশই করত না। স্বাধীন প্ল্যাটফর্মে কাজ করা শিল্পীদেরও তীব্র নজরদারি এবং গোয়েন্দা সংস্থার চাপ সামলাতে হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে অনেক চিত্রশিল্পী আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হন কিংবা রাজনৈতিক ব্যঙ্গচিত্র আঁকা পুরোপুরি থামিয়ে দেন।
এই ভয়ের পরিবেশ ভাঙতে শুরু করে ২০২৪ সালের জুলাই মাসের ছাত্র নেতৃত্বাধীন গণ–অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে। ওই সময়ে সরকারবিরোধী ব্যঙ্গচিত্রের একটি প্রবল ঢেউ দেখা যায়—যা স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নেয় এবং শেষ পর্যন্ত সেই শাসনের পতনের আগেই প্রতিবাদের শক্তিশালী মাধ্যমে পরিণত হয়।
তাহলে কেন এখন কেউ কেউ জুলাই বিপ্লবকে ব্যর্থ বলে অভিহিত করেন? জনসাধারণের পণ্যজনিত ফ্রি-রাইডার সমস্যাই এ বিষয়ে একটি ব্যাখ্যা তুলে ধরতে পারে।
.জুলাইয়ের অর্জন—মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রের সহিংসতার ওপর নিয়ন্ত্রণ—অর্জিত হয়েছে অসীম আত্মত্যাগের বিনিময়ে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১ হাজার ৪০০ জন শহীদ হন এবং ৩০ হাজার জন আহত হন; যাঁদের অনেকেই অঙ্গহানি, দৃষ্টিশক্তি হারানো বা গুলিবিদ্ধ হওয়ার মতো স্থায়ী ক্ষতির শিকার হন। এর সঙ্গে যুক্ত ছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের অদম্য সাহস ও আত্মত্যাগ এবং অসংখ্য সাধারণ নাগরিকের অবদান—যা এই বিপ্লবকে সফল করে তোলে বলে উল্লেখ করা হয়।
তবে যে জনসাধারণের পণ্য—মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রের সহিংসতার ওপর নিয়ন্ত্রণ—যাঁরা বিপ্লবের বিরোধিতা করেছিলেন বা তখন নীরব দর্শকের ভূমিকায় ছিলেন, তাঁদের কাছ থেকেও তা পুরোপুরি প্রত্যাহার করা সম্ভব নয়। এখন তাঁদের কেউ কেউ এই একই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ব্যবহার করে জুলাই অভ্যুত্থান ও এর নেতাদের গালমন্দ করছেন এবং অনেক ক্ষেত্রেই ভিত্তিহীন অনিয়মের অভিযোগ তুলছেন।
জুলাই বিপ্লবে অংশগ্রহণ করে পরবর্তী সময়ে যারা অপরাধ করেছে, তাদের অবশ্যই আইনের আওতায় এনে বিচার করতে হবে এবং আইনের বিধান অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু ভিত্তিহীন অভিযোগ অবশ্যই বন্ধ হওয়া উচিত।
.আমি ব্যক্তিগতভাবে জানি, জুলাই বিপ্লবের কিছু নেতা নিজেদের ২০২৬ সালের নির্বাচনী প্রচারের জন্য ন্যূনতম অর্থের সংস্থান করতেও হিমশিম খেয়েছিলেন।
আমি জুলাই বিপ্লবের শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই, আহতদের স্মরণ করি এবং এই আন্দোলনের নেতা ও অংশগ্রহণকারী ছাত্র ও খেটে খাওয়া মানুষের অদম্য সাহস ও আত্মত্যাগকে অভিবাদন জানাই।
মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান অর্থনীতিবিদ ও সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা
মতামত লেখকের নিজস্ব