শৈশবে আবদার মেটাতে তাঁকে কিনে দেওয়া হয়েছিল ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের একটি জার্সি। সেখানে কালো মার্কার দিয়ে তিনি লিখেছিলেন, ‘রোনালদো ৭’—ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোই যে তাঁর আদর্শ। আর মাঠে তাঁর খেলা দেখে লেগানেসের মালিক জেফ লুনাও সংবাদমাধ্যমে বলেন, ‘আমরা নতুন মেসি পেয়ে গেছি।’
গল্পটা যাঁর, তাঁর উত্থান যেন রূপকথার মতোই। বলা হচ্ছে আইভরিকোস্টের ১৯ বছর বয়সী তরুণ ইয়ান দিয়োমান্দের কথা। এখন রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে তাঁর ডানা মেলার অপেক্ষা। লাইপজিগে খেলা তরুণ এ উইঙ্গারকে কেনার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে রিয়াল। এখন কেবল আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার অপেক্ষা।
দিয়োমান্দের উত্থানের শুরুটা মাত্র এক বছর আগেই। ২০২৫ সালের মার্চের শেষ সপ্তাহের ঘটনা। আন্তর্জাতিক বিরতির সময় লেগানেসের বিপক্ষে সান্তিয়াগো বার্নাব্যু সফরের প্রস্তুতি নিচ্ছিল রিয়াল মাদ্রিদ। ওই সময় কেউ কল্পনাও করতে পারেননি, চোট নিয়ে লেগানেসের রিজার্ভ দলে যোগ দেওয়া অচেনা আইভোরিয়ান এই তরুণ মাত্র তিন দিন পরই রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে লা লিগায় অভিষেক করবেন।
দিয়োমান্দের উত্থানের গল্পের কথা তৎকালীন লেগানেস কোচ এবং বর্তমানে কাতারের আল আহলির দায়িত্বে থাকা বোর্হা হিমেনেস সংবাদমাধ্যমে জানিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, ‘ইয়ানের কথা প্রথম শুনি যখন লেগানেসের মালিক জেফ লুনাও আমাকে ইউটিউবের একটি ভিডিও দেখিয়েছিলেন। তখন ইয়ানের বয়স ছিল প্রায় ১৬ বছর। সে যুক্তরাষ্ট্রে ক্লাবের একটি ফুটবল একাডেমিতে খেলত। জেফ আমাকে বলেছিলেন, “আমরা নতুন মেসিকে পেয়ে গেছি।” ভিডিওতে ছেলেটির খেলা দেখে আমি সত্যিই বিস্মিত হয়েছিলাম।’
শুরু এরপর আরও দ্রুত গতিতে এগোয়। ডান পায়ের খেলোয়াড় হিসেবে পরিচিত হলেও দিয়োমান্দে দুই পায়েই সমান দক্ষ—এবং দুই উইংয়েই খেলতে পারেন। সেই কারণে যে কোনো কোচের কাছেই তাঁকে বিশেষভাবে ভাবা হয়। এই তরুণকে প্রথমবার খেলতে দেখে বিস্ময় লুকাতে পারেননি হিমেনেস। ‘রিজার্ভ দলের বিপক্ষে একটি প্রীতি ম্যাচে প্রথম আক্রমণেই আলতিমিরাকে কাটিয়ে বল অন্য পায়ে নিয়ে গেল। দ্বিতীয় আক্রমণও প্রায় একই রকম। তৃতীয়বার অসাধারণ প্রথম স্পর্শে দুর্দান্ত একটি থ্রু বল নিয়ন্ত্রণ করল। চতুর্থবার বক্সে বল পেয়ে পা বদলে দারুণ শটে জালের ওপরের কোণে বল পাঠিয়ে দিল। পঞ্চম ও ষষ্ঠ আক্রমণও ছিল একই রকম।’
ফাউল করার আশঙ্কায় ওই ম্যাচে দ্রুতই মাঠ থেকে তুলে নেওয়া হয় দিয়োমান্দেকে। তবে এই পারফরম্যান্সের ফলেই তাঁর অভিষেক আসে রিয়ালের বিপক্ষে। সেখানে তিনি জার্সি বদল করেন কিলিয়ান এমবাপ্পের সঙ্গে। যদিও তাঁর প্রয়াত বোন রোকসান দাবি করতেন, দিয়োমান্দে এমবাপ্পের চেয়ে ভালো ফুটবলার।
শুধু ফুটবল নয়, পরিবারও তাঁর জীবনবোধ গড়ে দিয়েছে। বলা হয়, কোনো এক পার্টিতে রোকসানের পানীয়তে কেউ কিছু মিশিয়ে দিয়েছিল। এরপর তিনি আর জেগে ওঠেননি এবং মারা যান। বোনকে হারানোর শোককে শক্তিতে পরিণত করে এখন ফুটবল পায়ে লড়ে যাচ্ছেন দিয়োমান্দে।
২০২৬ বিশ্বকাপের আগে ‘দ্য প্লেয়ার্স ট্রিবিউন’–এ এক খোলাচিঠিতে বোনের মৃত্যু নিয়ে দিয়োমান্দে লেখেন, ‘আমি বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। জানলাম, একটি পার্টিতে কেউ ওর পানীয়তে কিছু মিশিয়ে দিয়েছিল। এরপর আর জাগেনি। তোমার বয়স ছিল মাত্র ১৫। আজও জানি না, কেন এমন হলো। হয়তো হিংসা, হয়তো আমাদের দেশের বাস্তবতা। কখনো কখনো মনে হয়, যদি তোমাকে রক্ষা করতে পারতাম!’
ক্যারিয়ারের গতিও তাই ‘শো মাস্ট গো অন’ নীতিতে এগোয়। লেগানেসে দারুণ নৈপুণ্য দেখিয়ে দ্রুত চলে আসেন আলোচনায়। ২০২৪–২৫ মৌসুমের শেষ দিকে দিয়োমান্দের প্রভাব নিয়ে হিমেনেস বলেন, ‘ও যদি জানুয়ারির শুরুতেই আমাদের সঙ্গে যোগ দিত, তাহলে আমরা অবনমনে না গিয়ে কনফারেন্স লিগে খেলতাম। কিন্তু ও আমাদের সঙ্গে ছিল মাত্র দেড় মাস। একটু দেরিতেই এসেছিল। তবু সে আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। প্রতিটি ম্যাচেই সে খেলার মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো প্রভাব ফেলেছে।’
এত কম বয়সেই কখন পাস দেবেন, কখন ড্রিবল করবেন বা কখন শট নেবেন—এসব বিষয়ে তাঁর সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা মুগ্ধ করার মতো।
এই পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের জুলাইয়ে দিয়োমান্দে যোগ দেন লাইপজিগে। সে সময় স্পেনের বাইরে একাধিক ক্লাবের আগ্রহ ছিল তাঁকে নিয়ে। দিয়োমান্দেকে নিয়ে দর–কষাকষির ব্যাপারে হিমেনেস বলেন, ‘বিদেশের কয়েকটি ক্লাব আমাকে ফোন করে বলেছিল, দুই কোটি ইউরো অনেক বেশি। আমি তখন বলেছিলাম, এক-দুই বছরের মধ্যেই ওর দাম দ্বিগুণ, এমনকি তিন গুণ হয়ে যাবে।’
তবে হিমেনেসের এই বক্তব্যের সঙ্গে পরের তথ্যের পার্থক্যও রয়েছে। সংবাদমাধ্যগুলো বলছে, দিয়োমান্দেকে কিনতে রিয়ালের খরচ হচ্ছে ৬ গুণ বেশি অর্থ—১২ কোটি ইউরো।
ক্লাব ফুটবলে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স তাঁকে সুযোগ করে দেয় জাতীয় দলেও। জায়গা করে নেন বিশ্বকাপে ২৬ সদস্যের দলেও। বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম উদ্বোধনী ম্যাচে ইকুয়েডরের বিপক্ষে আইভরিকোস্টের শুরুর একাদশে ছিলেন দিয়োমান্দে। ১–০ গোলের সেই জয়ে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের জন্য ম্যাচসেরাও হন দিয়োমান্দে।
একই সঙ্গে ১৯ বছর ২১২ দিন বয়সে আইভরিকোস্টের হয়ে বিশ্বকাপে সর্বকনিষ্ঠ ফুটবলার হিসেবে খেলার ইতিহাসও গড়েন দিয়োমান্দে। কুরাসাওয়ের বিপক্ষে ২–০ গোলের জয়ে একটি গোলে সহায়তা করেন দিয়োমান্দে। ১৯ বছর ২২৩ দিন বয়সে বিশ্বকাপে আইভরিকোস্টের হয়ে সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে অ্যাসিস্ট করার কীর্তিও গড়েন।
এই ধারাবাহিকতাই এখন দিয়োমান্দেকে নিয়ে এসেছে সান্তিয়াগো বার্নাব্যুর দরজায়। দুর্দান্ত গতি, অসাধারণ ড্রিবলিং দক্ষতা এবং ক্ষিপ্রতায় প্রতিপক্ষের মিডফিল্ড ও রক্ষণ তছনছ করার ক্ষমতার কথা বারবার উঠে আসছে। তবে তাঁকে আলাদা করে তোলে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ও ধারাবাহিকতা।
এত কম বয়সেই কখন পাস দেবেন, কখন ড্রিবল করবেন বা কখন শট নেবেন—এসব বিষয়ে তাঁর সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা মুগ্ধ করার মতো। সেই সঙ্গে নিয়মিত গোল করা ও সতীর্থদের দিয়ে গোল করানোর সামর্থ্যও দেখা যাচ্ছে। এখন সেই কার্যকারিতা দিয়ে রিয়ালের ভাগ্য বদলানোর চ্যালেঞ্জ সামনে দিয়োমান্দের।
শুধু ফুটবলার হিসেবেই নন, দিয়োমান্দের জীবনবোধও পরিণত। একসময় অর্থের অভাবে আলু চুরি করে খাওয়া এই ফুটবলারের অর্থের প্রতি মোহ ভেঙে গেছে। তিনি ‘খোলাচিঠিতে’ লিখেছেন, ‘আমি আর ধনী হতে চাই না। টাকার কারণে মানুষ, এমনকি পরিবারের সদস্যরাও বদলে যায়। লেগানেসে থাকাকালে যা আয় করেছি, সব বাড়িতে পাঠিয়েছি। পরে এমন হয়েছে, আর টাকা উপার্জনই করতে চাইতাম না। সবাই শুধু আরও চাইত। অথচ আমার নিজের কোনো ফ্ল্যাটও ছিল না। আমি অনুশীলন কেন্দ্রের ছোট্ট একটি ঘরে থাকতাম। সেখানে টিভিও ছিল না। শুধু ফুটবল আর ঘুম—এই ছিল জীবন।’
এই কথাগুলোই ইঙ্গিত দেয়, সফলতা ও খ্যাতি দিয়োমান্দেকে একটুও বদলাতে পারেনি। রিয়ালের মতো ক্লাবে পা মাটিতে রাখার এই গুণ যে তাঁকে অনেক দূর এগিয়ে দেবে—সেটাই এখন দেখার অপেক্ষা।