খুলনা সার্কিট হাউজ মাঠে আয়োজিত মাসব্যাপী বৃক্ষমেলায় দর্শনার্থীদের প্রধান আকর্ষণ হয়ে দাঁড়িয়েছে জাপানের জনপ্রিয় ফল পার্সিমন। আপেলের মতো দেখতে এই ফলের চারার প্রতি ক্রেতা ও দর্শনার্থীদের ব্যাপক আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। একই সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের বিরল প্রজাতির ফল ও ফুলের গাছের সমারোহ মেলাটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের ম্যানগ্রোভ প্রদর্শনীও দর্শকদের বিশেষ নজর কাড়ছে।

মেলায় করিম নার্সারির স্টলে ফলভর্তি পার্সিমন গাছ ঘিরে সবচেয়ে বেশি কৌতূহল লক্ষ্য করা গেছে। আপেলের মতো দেখতে এই ফলের প্রতি কেজিতে সাধারণত ৮ থেকে ১০টি ফল ধরে এবং ফলসহ একটি গাছের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৩০ হাজার টাকা।

করিম নার্সারির ৯০ বছর বয়সী স্বত্বাধিকারী আব্দুল করিম জানান, প্রায় তিন দশক ধরে তিনি দেশি-বিদেশি বিভিন্ন জাতের ফল ও ফুলের চারা সংগ্রহ ও উৎপাদন করছেন। বর্তমানে তার ছেলে ও নাতিরা রূপসা ও শেরেবাংলা রোডসহ খুলনার তিনটি নার্সারি পরিচালনা করছেন। তিনি বলেন, "ভারতের মাধ্যমে সংগ্রহ করা পার্সিমনের চারা ২০২৪ সালে প্রথম খুলনায় নিয়ে আসেন।"

করিম নার্সারির স্টলে পার্সিমনের পাশাপাশি মামি সাপোটা, বেলজিয়াম লিচু, রুবি লংগান, তাইওয়ান রেড আম, ম্যাঙ্গোস্টিন, সিলভিয়ান চেরি, আঠাবিহীন ডুরিয়ান, পিংক কাঁঠাল, সাদা জাম, পিমপম লংগানসহ প্রায় ৫৫টি বিদেশি এবং ৫০টির মতো দেশীয় প্রজাতির ফল ও ফুলের গাছ প্রদর্শিত হচ্ছে। এসব চারার দাম ২ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকার মধ্যে।

দর্শনার্থী মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, "সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পার্সিমন ফল দেখেছি। এবার প্রথমবার ফলসহ গাছ দেখলাম। দাম বেশি হলেও সংগ্রহ করার ইচ্ছা আছে।"

ক্রেতা সুমনা আক্তার বলেন, "বিদেশি ফলের গাছ সংগ্রহ করা আমার শখ। তাই পার্সিমনসহ কয়েকটি নতুন জাতের চারা কিনেছি।"

মেলার অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে রয়েছে বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের সিলভিকালচার বিভাগের ম্যানগ্রোভ প্রদর্শনী। এখানে সুন্দরবনের লবণসহিষ্ণু বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারা, বীজ, কাঠের নমুনা এবং সংরক্ষিত জলজ প্রাণী প্রদর্শন করা হচ্ছে। প্রদর্শনীতে সুন্দরী, গরান, গেওয়া, কেওড়া, বাইন, ধুন্দুল ও খলিশাসহ বিভিন্ন ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদের পাশাপাশি গলদা চিংড়ি, বেলে মাছ, কাঁকড়া, কুমিরের নমুনা এবং বাঘের মাথার খুলিও রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণা কর্মকর্তা শেখ মো. মেহেদী হাসান বলেন, "ম্যানগ্রোভ গাছ কৃষিজমিতে টিকে থাকলেও এর বিস্তৃত শ্বাসমূল আশপাশের ফসলের উৎপাদনে প্রভাব ফেলতে পারে। পাশাপাশি ব্যক্তিগত বা বাণিজ্যিকভাবে এসব গাছের ব্যাপক চাষ সুন্দরবনের প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্যের জন্যও ঝুঁকির কারণ হতে পারে।"

খুলনা নার্সারি মালিক সমিতির সভাপতি এস এম বদরুল আলম রয়্যাল জানান, ১১ জুলাই শুরু হওয়া এই বৃক্ষমেলা আগামী ৮ আগস্ট পর্যন্ত চলবে। মেলায় ৫৭টি নার্সারি ও সুন্দরবনসহ পাঁচটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের মোট ৬২টি স্টল অংশ নিয়েছে। গত বুধবার পর্যন্ত ফুল, ফলজ, বনজ ও ঔষধি মিলিয়ে প্রায় ২৫ হাজার গাছ বিক্রি হয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ৪০ লাখ টাকা।

তবে কিছু নার্সারি মালিক অভিযোগ করেছেন যে, মেলার স্থানটি শহরের কেন্দ্র থেকে দূরে হওয়ায় এবং প্রচারণার অভাব থাকায় প্রত্যাশিত সংখ্যক ক্রেতা আসছেন না। তাদের দাবি, আগামী বছর শহরের কেন্দ্রস্থল বা প্রধান সড়কসংলগ্ন স্থানে মেলার আয়োজন করা হলে দর্শনার্থীর সংখ্যা এবং বিক্রি—উভয়ই উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।