পিরোজপুরে শিশুদের জন্য একটি আধুনিক বিনোদনকেন্দ্র গড়ে তোলার স্বপ্ন নিয়ে প্রায় ছয় বছর আগে উদ্যোগ নেওয়া হলেও দীর্ঘ সময় ধরে তা আলোর মুখ দেখেনি। ২০২০ সালে কাজ শুরু হলেও এখন পর্যন্ত কেবল একটি সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করা হয়েছে, মূল কাজ এখনো বাকি। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে প্রকল্পটির নাম পরিবর্তিত হলেও এর ভাগ্য বদলায়নি। ফলে জেলার প্রায় ১২ হাজার শিশু এখনো একটি নিরাপদ ও আধুনিক বিনোদনকেন্দ্রের অপেক্ষায় দিন গুনছে। তবে সম্প্রতি জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে যে, আগামী আগস্ট মাসের মধ্যেই পুনরায় নির্মাণকাজ শুরু হবে এবং চলতি বছরের মধ্যেই তা সম্পন্ন করা হবে।
জানা গেছে, ১৮৮৫ সালে ইউনিয়ন থেকে পৌরসভায় উন্নীত পিরোজপুর ১৯৯০ সালে প্রথম শ্রেণির পৌরসভার মর্যাদা লাভ করে। তবে শহরের অবকাঠামোগত উন্নয়নের সাথে তাল মিলিয়ে শিশুদের জন্য কোনো আধুনিক বিনোদনকেন্দ্র গড়ে ওঠেনি। এই শূন্যতা পূরণে শহরতলীর মুক্তারকাঠী এলাকায় বলেশ্বর নদীর তীরে জেলা পরিষদের নিজস্ব জমিতে ১৭ কোটি ৪৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘শেখ রাসেল শিশু পার্ক’ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়, যা বর্তমানে ‘পিরোজপুর শিশু পার্ক’ নামে পরিচিত।
২০২০-২১ অর্থবছর থেকে প্রকল্পটির প্রাথমিক কাজ শুরু হয়। প্রথম ধাপে নিচু জমি ভরাট ও সীমানা প্রাচীর নির্মাণের কাজ শেষ হলেও মূল পার্কের কাজ শুরু না হওয়ায় এলাকাটি বর্তমানে পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। সরেজমিনে দেখা যায়, মাঠটিতে গবাদিপশু চরে বেড়াচ্ছে এবং স্থানটি স্থানীয় কিশোরদের খেলার মাঠে পরিণত হয়েছে। এছাড়া জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে শহর থেকে আড়াই কিলোমিটার দূরে ডিসি পার্ক নির্মাণ করা হলেও সেখানে শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত সরঞ্জাম ও বিনোদনের ব্যবস্থা নেই, ফলে শিশুরা প্রত্যাশিত আনন্দ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
স্থানীয় অধিবাসী বাদল শেখ বলেন, "আমাদের দাবি হলো—এখানে শিশু পার্কটি হলে এই এলাকার উন্নয়ন হবে এবং স্থানীয় মানুষদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি এই রাস্তাটি ভেঙে নদীতে বিলীন হয়ে গেছে, এটি সংস্কার করা প্রয়োজন। এতে শিক্ষার্থীসহ এলাকার মানুষের যাতায়াতে সুবিধা হবে। তাই দ্রুত বর্তমান জেলা পরিষদের প্রশাসক আলমগীর ভাইয়ের কাছে এই পার্কটির প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি জানাচ্ছি।"
শহরের শিক্ষার্থী নাজিফা নোভা বলেন, "এখানে ১৭ কোটি টাকার প্রকল্প থাকলেও কাজ হয়েছে মাত্র সামান্য। রাস্তাটিরও কোনো উন্নতি নেই এবং পার্কের একটি বাউন্ডারি ওয়াল ছাড়া কিছুই হয়নি। আমাদের দাবি, এই পার্কটি যেন খুব দ্রুত নির্মাণ করা হয়, যাতে আমাদের ছোট ভাই-বোনদের নিয়ে ঘুরতে আসতে পারি। আশা করি, পার্ক ও রাস্তার কাজ অতি শিগগিরই সম্পন্ন হবে।"
আরেক শিক্ষার্থী ইসরাফিল বলেন, "পার্ক মূলত বিনোদনের জন্যই বানানো হয়, কিন্তু আমাদের এখানে পার্কের কাজ শুরু হলেও একটি দেয়াল ছাড়া আর কিছুই হয়নি। পার্কের সামনে বলেশ্বর নদীর পাশ ঘেঁষে যে রাস্তাটি আছে, সেটি খুব ঝুঁকিপূর্ণ হলেও সংস্কার করা হচ্ছে না। এখানে যে একটি পার্ক করা হচ্ছে, তা দেখে বোঝার উপায় নেই। আমরা যারা শিক্ষার্থী, ছুটির দিনে ঘুরতে যেতে চাইলে অনেক দূরে যেতে হয়। আমাদের আশপাশে কোনো পার্ক বা বিনোদনকেন্দ্র নেই। আমার দাবি, এখানে যে পার্কের প্রকল্প শুরু হয়েছে, তা সুন্দরভাবে বাস্তবায়ন করা হোক।"
এ বিষয়ে পিরোজপুর জেলা পরিষদের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মাদ মনিরুজ্জামান জানান, পিরোজপুর সদর উপজেলায় ১৭ কোটি ৪৫ লাখ টাকা ব্যয়ে শিশু পার্ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তবে প্রাথমিকভাবে ১ কোটি ১৩ লাখ টাকা বরাদ্দ পাওয়া যায়। ওই অর্থ দিয়ে বাউন্ডারি ওয়ালসহ কিছু কাজ করা হলেও পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় অর্থ না পাওয়ায় মূল কাজ বন্ধ থাকে। নতুন বরাদ্দ পেলে আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণ সম্ভব হবে বলে তিনি জানান। পাশাপাশি প্রকল্পে কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।
জেলা পরিষদের প্রশাসক আলমগীর হোসেন বলেন, "বলেশ্বরকে ঘিরে আমাদের জেলা পরিষদের নিজস্ব জমিতে একটি শিশু পার্কের অবস্থান রয়েছে। গত চব্বিশের পটপরিবর্তনের পর বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নির্দেশে দায়িত্ব গ্রহণের পর আমরা এখন পর্যন্ত ওখানে কাজ করতে পারিনি। এর কারণ হলো—বিগত দিনে ওই শিশু পার্ক ঘিরে একদল লুটেরা অনিয়ম করেছে বলে জেনেছি। যে কারণে এই ফাইলগুলো নিয়ে দুদকসহ অন্যান্য সংস্থার লোকজন অনুসন্ধান শুরু করেছেন এবং যে অভিযোগগুলো রয়েছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আমরাও অভ্যন্তরীণভাবে নির্বাহী কর্মকর্তাসহ একটি টিম গঠন করে খতিয়ে দেখছি কোথায় কী অনিয়ম হয়েছে।"
তিনি আরও বলেন, "এটি পিরোজপুরবাসীর বিশেষ করে শিশুদের জন্য একটি প্রাণের দাবি। আমি চেষ্টা করছি আগামী আগস্ট মাসের মধ্যে কাজ শুরু করার। ইতিমধ্যে জায়গাটি পরিদর্শন করেছি। নতুন করে বরাদ্দ দেওয়ার চেষ্টা করছি। আশা করি, চলতি বছরের মধ্যেই স্থানটিতে একটি সুন্দর পার্ক নির্মাণ করতে পারব।"
উল্লেখ্য, পিরোজপুর পৌরসভায় বর্তমানে ৩৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ১৮টি কিন্ডারগার্টেন রয়েছে, যেখানে শিশু থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় ১২ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। তাদের বিনোদনের জন্য কোনো আধুনিক পার্ক নেই। পিরোজপুরবাসীর প্রত্যাশা, দ্রুত অর্থ নিশ্চিত করে নির্মাণকাজ শেষ করা হবে, যা শিশুদের নিরাপদ বিনোদনের পাশাপাশি শহরের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশে ভূমিকা রাখবে।