দেশের সামগ্রিক বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের নাজুক পরিস্থিতির এক স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে ১৬ থেকে ২০তম গ্রেডের চাকরির জন্য উচ্চশিক্ষিত তরুণদের তীব্র প্রতিযোগিতার মাঝে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোতেও উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের উচ্চহারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর পেছনে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মবাজার উপযোগী দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে ব্যর্থ হওয়া একটি বড় কারণ। তবে নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টিতে একটি রূঢ় সত্য বরাবরই উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে—বাংলাদেশের বর্তমান শ্রমবাজারের সক্ষমতা প্রতিবছর সাত লাখের বেশি স্নাতকের চাপ নেওয়ার মতো নয়।
বর্তমান বাস্তবতায় কারিগরি শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। প্রতিবছর শ্রমবাজারে প্রায় ২২ থেকে ২৩ লাখ তরুণ প্রবেশ করলেও সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে শোভন কর্মসংস্থান মেলে মাত্র তিন লাখ তরুণের জন্য। ফলে প্রতিবছর ৮ থেকে ৯ লাখ তরুণ কাজের সন্ধানে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমাতে বাধ্য হন। কিন্তু দক্ষতার অভাবে দেশে ও বিদেশে তারা সস্তা শ্রমের কাজ বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বৃত্তিমূলক কাজে দক্ষ করে তোলা গেলে তারা কেবল নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনই করতেন না, বরং দেশের অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারতেন।
কারিগরি শিক্ষা নিয়ে নীতিনির্ধারকদের মুখে আশাবাদের কথা শোনা গেলেও বাস্তব চিত্রটি ভিন্ন। ১৯৯৫ সালে এসএসসি ভোকেশনাল শিক্ষাক্রম চালু হওয়ার ৩১ বছর পরও একে একটি সুসমন্বিত কাঠামোর ওপর দাঁড় করানো সম্ভব হয়নি। সামগ্রিক পরিকল্পনার অভাব থাকায় কেবল প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে, কিন্তু দক্ষ শিক্ষক, ল্যাবরেটরি ও প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণের ঘাটতির কারণে শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। এই পরিস্থিতি প্রশ্ন তোলে, দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের সন্তানরা এই ধারায় পড়াশোনা করে বলেই কি ভোকেশনাল শিক্ষা এমন অবহেলার শিকার হচ্ছে?
মুক্তকণ্ঠের এক প্রতিবেদনে কারিগরি শিক্ষার এই দায়সারা চিত্র স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। দেশে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ১২ হাজার ৯৪২টি। এসব প্রতিষ্ঠানে আসনসংখ্যা ২০ লাখের কাছাকাছি হলেও ভর্তি হয়েছেন মাত্র ১০ লাখ শিক্ষার্থী। সরকারি ও বেসরকারি পলিটেকনিক্যাল এবং এসএসসি (ভোকেশনাল)—সবক্ষেত্রেই একই দৈন্যদশা বিদ্যমান। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, অনুমোদনপ্রাপ্ত ৩ হাজার ৪৪০টি ভোকেশনাল প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ছয় শতাধিক প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর শিক্ষার্থীশূন্য অবস্থায় পড়ে আছে।
অচল হয়ে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোকে নোটিশ দেওয়া এবং শর্ত পূরণ না হলে বন্ধ করে দেওয়ার কথা জানিয়েছে কারিগরি শিক্ষা বোর্ড। তবে কারিগরি শিক্ষাব্যবস্থার এই গভীর সংকট নিরসনে এটি কোনো কার্যকর সমাধান হতে পারে না। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে হলে এই খাতকে যেনতেনভাবে চালানোর মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কেবল প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি নয়, বরং মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
আমাদের মনে হয়, সারা দেশের বিদ্যমান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর একটি সমন্বিত স্কুল ম্যাপিং করা প্রয়োজন। সেই অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন, শিক্ষক নিয়োগ এবং অবকাঠামো উন্নয়নের সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।